লর্ড রবার্টস

লর্ড রবার্টস (১৮৩২–১৯১৪), যিনি পূর্ণ নামে ফ্রেডরিক রবার্টস, ১ম আর্ল রবার্টস নামে পরিচিত, ছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী সামরিক নেতা এবং ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান কমান্ডার। উনবিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সামরিক অভিযানের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে তাঁর নাম জড়িয়ে আছে। ১৮৩২ সালে ভারতে জন্মগ্রহণকারী এই আইরিশ বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ জেনারেল তাঁর দীর্ঘ সামরিক জীবনের বড় একটি অংশ কাটিয়েছেন ভারত ও আফগানিস্তানে।

তাঁর কর্মজীবনের মূল দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

  • আফগান যুদ্ধের বীর: দ্বিতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধের সময় লর্ড রবার্টস তাঁর সামরিক প্রতিভার চরম পরিচয় দেন। ১৮৮০ সালে মেইওয়ান্ডের যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর বিপর্যয়ের পর, তিনি কাবুল থেকে কান্দাহার পর্যন্ত এক ঐতিহাসিক ও দ্রুতগামী সামরিক অভিযাত্রার নেতৃত্ব দেন। প্রায় ৩২০ মাইল পথ মাত্র ২০ দিনে অতিক্রম করে তিনি কান্দাহারে পৌঁছান এবং আইয়ুব খানের বাহিনীকে পরাজিত করেন। এই বীরত্বপূর্ণ অর্জনের জন্য তাঁকে ‘কন্দাহারের লর্ড রবার্টস’ (Roberts of Kandahar) উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

  • সামরিক সংস্কার: ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর পুনর্গঠনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ পদ্ধতি, অস্ত্রশস্ত্রের আধুনিকায়ন এবং পার্বত্য যুদ্ধের কৌশলে আমূল পরিবর্তন আনেন। তাঁর গৃহীত সংস্কারগুলো পরবর্তী কয়েক দশক ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

  • সাম্রাজ্যবাদী কৌশল: রবার্টস মনে করতেন, রাশিয়ার প্রভাব থেকে ব্রিটিশ ভারতকে বাঁচাতে আফগানিস্তানের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা অপরিহার্য। তবে দ্বিতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধের কঠিন অভিজ্ঞতার পর তিনি ব্রিটিশ নীতিনির্ধারকদের এই পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, আফগানিস্তানকে পুরোপুরি দখল করার চেয়ে তাদের সাথে একটি মিত্রতামূলক কিন্তু নিয়ন্ত্রণমূলক সম্পর্ক রাখা বেশি যুক্তিযুক্ত।

  • দক্ষিণ আফ্রিকা ও পরবর্তী জীবন: আফগানিস্তানে সাফল্যের পর তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘বোর যুদ্ধে’ (Boer War) ব্রিটিশ বাহিনীর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সামরিক ক্যারিয়ারের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদ ‘ফিল্ড মার্শাল’-এ উন্নীত হন।

লর্ড রবার্টসকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রণকৌশলী মনে করা হলেও, আফগানদের দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি ছিলেন সাম্রাজ্যবাদের এমন এক প্রতিনিধি, যিনি আফগানিস্তানের স্বাধীনতা ও স্বকীয়তাকে বারবার পদদলিত করার প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। মেইওয়ান্ডের যুদ্ধে আফগান প্রতিরোধের পর কান্দাহারে তাঁর জয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মনোবল পুনরুদ্ধার করলেও, এটি আফগান জনগণের মনে ব্রিটিশদের প্রতি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভের কারণ হয়েছিল। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে বেলজিয়ামে পরিদর্শনের সময় নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।