‘দৈনিক ইত্তেহাদ’ অবিভক্ত বাংলার শেষ লগ্নে এবং দেশভাগের পরপরবর্তী সময়ের একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী, প্রগতিশীল এবং ঐতিহাসিক বাংলা সংবাদপত্র। ১৯৪৭ সালে কলকাতা থেকে এই পত্রিকাটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। রাজনৈতিক মুখপত্র হিসেবে শুরু হলেও এর উন্নত সাংবাদিকতা ও সাহিত্যমান তৎকালীন সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
প্রতিষ্ঠা ও পটভূমি
-
প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক: অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এবং প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আর্থিক আনুকূল্যে ও পৃষ্ঠপোষকতায় পত্রিকাটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
-
প্রকাশকাল ও সম্পাদক: ১৯৪৭ সালের জানুয়ারি মাসে কলকাতা থেকে এটি প্রকাশিত হতে শুরু করে। প্রখ্যাত সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ এই পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন।
রাজনৈতিক ভূমিকা ও নীতি
-
প্রগতিশীল মুসলিম লীগ: পত্রিকাটি মূলত বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম সমর্থিত প্রগতিশীল অংশের মুখপত্র হিসেবে কাজ করত।
-
অখণ্ড বাংলার সমর্থন: দেশভাগের ঠিক আগে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শরৎচন্দ্র বসু যে ‘অখণ্ড স্বাধীন বাংলা’ (United Bengal) গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’ সেই প্রস্তাবের পক্ষে জোরালো সমর্থন জানিয়েছিল।
-
বাঙালি মুসলমানের অধিকার: দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের অধিকার ও দাবি-দাওয়ার বিষয়ে পত্রিকাটি অত্যন্ত সোচ্চার ভূমিকা পালন করে।
সাংবাদিকতা ও সাহিত্যিক অবদান
তৎকালীন সাংবাদিকতায় ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’ একটি নতুন ধারার সূচনা করেছিল। ভাষা, মেকআপ এবং সংবাদ পরিবেশনে এটি ছিল অত্যন্ত আধুনিক। প্রখ্যাত সাংবাদিক মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ এই পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলেন।
এছাড়া পত্রিকাটির সাহিত্য পাতা (রবিবাসরীয় বিভাগ) ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। প্রখ্যাত কবি আহসান হাবীব এই সাহিত্য পাতার সম্পাদক ছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, ফররুখ আহমদ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আবদুল গণি হাজারীর মতো প্রথিতযশা কবি ও সাহিত্যিকদের পদচারণায় ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’-এর সাহিত্য বিভাগ সেসময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।
প্রকাশনা বন্ধ ও বিলুপ্তি
১৯৪৭ সালে ভারতভাগের পর পত্রিকাটির কার্যালয় কলকাতায় থেকে গেলেও এর মূল পাঠকগোষ্ঠী ছিল পূর্ববঙ্গে (বর্তমান বাংলাদেশ)। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকার (বিশেষ করে খাজা নাজিমুদ্দীন এবং ‘দৈনিক আজাদ’-এর সম্পাদক মাওলানা আকরম খাঁর নেতৃত্বাধীন অংশ) রাজনৈতিক বিরোধিতার জেরে পূর্ব পাকিস্তানে ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’ প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
পাঠক ও বাজার হারানোর ফলে চরম আর্থিক সংকটে পড়ে পত্রিকাটি। শেষ পর্যন্ত পূর্ববঙ্গে এর কার্যালয় স্থানান্তরের চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং ১৯৫০ সালের দিকে এই ঐতিহাসিক ও প্রতিশ্রুতিশীল সংবাদপত্রটির প্রকাশনা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।