উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণ এবং শিক্ষাবিস্তারের ইতিহাসে ‘নর্ম্যাল স্কুল’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাম। ‘নর্ম্যাল স্কুল’ বলতে মূলত শিক্ষক শিক্ষণ প্রতিষ্ঠান বা টিচার্স ট্রেনিং স্কুলকে বোঝায়। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার প্রসার এবং বিদ্যালয়গুলোর জন্য যোগ্য ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক তৈরির মহান উদ্দেশ্যে এই স্কুলগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
নামের উৎপত্তি ও উদ্দেশ্য
-
উৎপত্তি: ‘নর্ম্যাল’ শব্দটি এসেছে ফরাসি শব্দ ‘École Normale’ (একোল নর্ম্যাল) থেকে। এর অর্থ হলো শিক্ষার একটি আদর্শ বা মান (Norm) তৈরি করা।
-
উদ্দেশ্য: সেই সময়ে গ্রামে-গঞ্জে অনেক বাংলা বিদ্যালয় বা মডেল স্কুল গড়ে উঠলেও সেখানে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পড়ানোর মতো যোগ্য শিক্ষকের চরম অভাব ছিল। শিক্ষাদানের একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড তৈরি করা এবং বাংলা মাধ্যমে পাঠদানের জন্য উপযুক্ত শিক্ষক তৈরি করাই ছিল নর্ম্যাল স্কুলের প্রধান লক্ষ্য।
প্রতিষ্ঠা ও ইতিহাস
-
বিদ্যাসাগরের উদ্যোগ: ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ সরকারের ‘উডের ডেসপ্যাচ’ (Wood’s Despatch) বা শিক্ষা নির্দেশনামা প্রকাশের পর মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রসারে জোর দেওয়া হয়। এই নির্দেশনার সূত্র ধরে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে এবং সরকারি সহায়তায় ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় সংস্কৃত কলেজের অধীনে প্রথম ‘বাংলা নর্ম্যাল স্কুল’ প্রতিষ্ঠিত হয়।
-
শাখা ও বিস্তার: কলকাতার পাশাপাশি বিদ্যাসাগরের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে হুগলি, বর্ধমান, মেদিনীপুর এবং ঢাকাতেও নর্ম্যাল স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই স্কুলগুলোতে শিক্ষকদের বাংলা ভাষা, গণিত, ভূগোল, ইতিহাস এবং শিক্ষাদানের আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ
নর্ম্যাল স্কুলের সাথে সমকালীন বাংলার অনেক বরেণ্য ব্যক্তিত্ব যুক্ত ছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর প্রতিষ্ঠিত কলকাতার নর্ম্যাল স্কুলে প্রখ্যাত লেখক ও সমাজসংস্কারক অক্ষয়কুমার দত্তকে প্রধান শিক্ষক (হেডমাস্টার) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এছাড়া রামকমল ভট্টাচার্য, মধুসূদন বাচস্পতি প্রমুখ পণ্ডিত ব্যক্তিরা এই স্কুলের শিক্ষকতার সাথে যুক্ত ছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নর্ম্যাল স্কুল
নর্ম্যাল স্কুলের প্রসঙ্গে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে। শৈশবে তিনি ওরিয়েন্টাল সেমিনারি ছাড়ার পর কিছুদিন কলকাতার একটি নর্ম্যাল স্কুলে (ক্যালকাটা নর্ম্যাল স্কুল) ভর্তি হয়েছিলেন। তবে এই স্কুলের যান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা, আনন্দহীন পরিবেশ এবং শিক্ষকদের কঠোর ও রূঢ় আচরণ তাঁর শিশুমনে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর বিখ্যাত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘জীবনস্মৃতি’-তে নর্ম্যাল স্কুলের এই দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার কথা তিনি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
নর্ম্যাল স্কুল খুব দীর্ঘস্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না হলেও, বাংলার শিক্ষাব্যবস্থায় এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। বাংলায় প্রথম বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষক প্রশিক্ষণের ধারণা প্রবর্তন করতে এবং মাতৃভাষার মাধ্যমে আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার প্রসারে নর্ম্যাল স্কুলগুলো ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল।