জেনানা মিশন (Zenana Mission) হলো ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতে খ্রিস্টান নারী ধর্মপ্রচারক বা মিশনারিদের দ্বারা পরিচালিত একটি বিশেষ উদ্যোগ, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল পর্দাশীল ভারতীয় নারীদের মধ্যে শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা প্রদানের মাধ্যমে খ্রিস্টধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটানো। ফারসি শব্দ ‘জান’ (অর্থ নারী বা স্ত্রীলোক) থেকে ‘জেনানা’ শব্দের উৎপত্তি, যা দ্বারা মূলত অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের অন্দরমহল বা অন্তঃপুরকে বোঝায়, যেখানে পরিবারের বাইরের কোনো পুরুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। যেহেতু পুরুষ মিশনারিদের জেনানায় বা অন্দরমহলে প্রবেশের অনুমতি ছিল না, তাই নারী মিশনারিদের মাধ্যমেই এই মিশন পরিচালনা করা হতো।
প্রেক্ষাপট ও প্রতিষ্ঠা
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও, মিশনারিরা লক্ষ্য করেন যে ভারতীয় সমাজের উচ্চবিত্ত হিন্দু ও মুসলিম পরিবারের নারীরা অত্যন্ত কড়াকড়িভাবে পর্দাপ্রথা মেনে চলেন এবং তারা কখনোই অন্দরমহলের বাইরে বের হন না। ফলে পুরুষ ধর্মপ্রচারকদের পক্ষে তাদের কাছে খ্রিস্টান ধর্মের বাণী পৌঁছানো বা সাধারণ স্কুলে এনে শিক্ষা প্রদান করা প্রায় অসম্ভব ছিল। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে ১৮৪০ সালে টমাস স্মিথ নারী মিশনারিদের জেনানায় পাঠানোর প্রথম প্রস্তাব দেন। পরবর্তীতে ১৮৫২ সালে ব্রিটিশ সরকারের সমর্থন ও সহযোগিতায় মেরি জেইন কেনার্ড (Mary Jane Kinnaird) আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জেনানা মিশন’ নামের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৫৪ সাল থেকে এলিজাবেথ সেল (Elizabeth Sale), হানা ক্যাথরিন মুলেন্স-এর মতো নারী মিশনারিরা সরাসরি হিন্দু ও মুসলিম নারীদের বাড়িতে গিয়ে পাঠদান ও মতবিনিময় শুরু করেন।
কার্যক্রম ও বিস্তার
জেনানা মিশনের মূল কার্যক্রম ছিল ঘরে আবদ্ধ নারীদের কাছে গিয়ে পরিকল্পিতভাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া। প্রথমদিকে নারী মিশনারিরা এবং তাদের সহযোগী দেশীয় ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান নারীরা (যাদের ‘বাইবেল উইমেন’ বা Bible women বলা হতো) জেনানায় গিয়ে নারীদের সেলাই, সূচিকর্ম এবং অক্ষরজ্ঞানের পাশাপাশি বাইবেলের বাণী শোনাতেন। পরবর্তীতে মিশনারিরা অনুধাবন করেন যে কঠোর পর্দাপ্রথার কারণে ভারতীয় নারীরা সাধারণ চিকিৎসাসেবা থেকে মারাত্মকভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই ১৮৮০-এর দশক থেকে জেনানা মিশনগুলো ইংল্যান্ড থেকে নারী চিকিৎসকদের নিয়ে এসে অন্দরমহলের নারীদের আধুনিক চিকিৎসাসেবা দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর ফলে জেনানা মিশনের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘জেনানা বাইবেল অ্যান্ড মেডিকেল মিশন’ (Zenana Bible and Medical Mission)।
১৮৮২ সালের ভারতীয় শিক্ষা কমিশনের (হান্টার কমিশন) সুপারিশ অনুযায়ী সরকার জেনানা শিক্ষায় নিয়োজিত মিশনারিদের সরকারি অনুদান প্রদান করতে শুরু করে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ায় বিশ শতকের গোড়ার দিকে প্রায় চল্লিশটি মিশনারি সংস্থা জেনানা শিক্ষায় যুক্ত হয়। এদের মধ্যে ‘চার্চ অব ইংল্যান্ড জেনানা মিশনারি সোসাইটি’, ‘ব্যাপটিস্ট ফিমেল মিশনারি সোসাইটি’ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ফলাফল ও বিলুপ্তি
জেনানা মিশন ভারতে নারী শিক্ষা ও নারীদের স্বাস্থ্যসেবার প্রাথমিক বিস্তারে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু তাদের মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ ভারতীয় নারীদের খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করার প্রচেষ্টা অনেকাংশেই ব্যর্থ হয়। তৎকালীন সময়ের নারীরা নারী মিশনারিদের কাছ থেকে শিক্ষা ও আধুনিক চিকিৎসাসেবা সানন্দে গ্রহণ করলেও, নিজেদের ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টধর্ম সেভাবে গ্রহণ করেননি।
পাশাপাশি, বিশ শতকের গোড়ার দিকে সমাজে আধুনিকায়ন, নগরায়ণ এবং ব্রাহ্ম আন্দোলনের মতো সামাজিক সংস্কারের প্রভাবে নারীরা ধীরে ধীরে পর্দাপ্রথা ভেঙে অন্দরমহলের বাইরে বেরিয়ে আসতে শুরু করেন। প্রাতিষ্ঠানিক স্কুল-কলেজে মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকায় বাড়িতে গিয়ে জেনানা শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা ক্রমশ কমতে থাকে। ধর্মান্তরকরণের এই ব্যর্থতা এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের বিষয়টি অনুধাবন করে ১৯৩৩ সালে সরকার জেনানা শিক্ষায় নিয়োজিত সকল মিশনে সরকারি অনুদান প্রদান সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়, যার ফলে অচিরেই প্রাতিষ্ঠানিক জেনানা শিক্ষা ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটে।