খালেদা জিয়া

খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ ভারতের বঙ্গ প্রদেশের জলপাইগুড়িতে। তার পৈতৃক নিবাস ফেনী জেলার ফুলগাজীতে। ১৯৬০ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তৎকালীন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সাথে তার বিয়ে হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি তার দুই সন্তানসহ পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দী ছিলেন।

১৯৮১ সালে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর, ১৯৮২ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনামলে দীর্ঘ আট বছর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আপসহীন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি দেশব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

প্রধানমন্ত্রিত্ব

১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতনের পর, ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে তার দল বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং তিনি প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার প্রথম মেয়াদেই দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা পুনরায় প্রবর্তিত হয়।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত একতরফা নির্বাচনের পর তিনি স্বল্প সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, তবে প্রবল গণআন্দোলন ও বিরোধী দলগুলোর চাপে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত করে তিনি পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে চারদলীয় জোটের নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তিনি পুনরায় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন এবং ২০০৬ সাল পর্যন্ত সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন।

আইনি জটিলতা ও মুক্তি

২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি প্রথম দুর্নীতির মামলায় আটক হন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে তিনি দীর্ঘ সময়ের জন্য কারাবন্দী হন। ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় তাকে শর্তসাপেক্ষে গৃহবন্দি অবস্থায় চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হয়।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাহী আদেশে তাকে মুক্তি দেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর আদালত তাকে এই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দুর্নীতি মামলাগুলো থেকে সম্পূর্ণরূপে খালাস প্রদান করে।

অসুস্থতা ও মৃত্যু

জীবনের শেষ বছরগুলোতে খালেদা জিয়া লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতা এবং হৃদরোগসহ নানাবিধ গুরুতর শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটলে তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ভোরে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

পরদিন ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে জাতীয় সংসদ ভবনের মানিক মিয়া এভিনিউতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং সশস্ত্র বাহিনীর গার্ড অব অনার প্রদানের পর জিয়া উদ্যানে তার স্বামী জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। তার মৃত্যুতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং সরকারি ছুটি ঘোষণা করে। দেশ-বিদেশের অসংখ্য রাজনৈতিক নেতা, রাষ্ট্রপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন।