বিজয় সেনের সুযোগ্য পুত্র বল্লাল সেন (আনুমানিক ১১৬০–১১৭৮ খ্রি.) ছিলেন প্রাচীন বাংলার সেন রাজবংশের তৃতীয় এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক। সামরিক পরাক্রমের চেয়ে তাঁর রাজত্বকাল সামাজিক সংস্কার, হিন্দু সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা এবং সাহিত্যিক অবদানের জন্য বাংলার ইতিহাসে সর্বাধিক স্মরণীয় হয়ে আছে। পিতার কাছ থেকে তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে এক সুসংগঠিত ও সুবিশাল সাম্রাজ্য লাভ করেছিলেন এবং নিজের শাসনামলে তিনি তা অত্যন্ত সফলভাবে অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন। সামরিক দিক থেকে তিনি মগধের (বিহার) কিছু অংশ জয় করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়, তবে তাঁর মূল মনোযোগ ছিল সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও সামাজিক পুনর্গঠনের দিকে।
বল্লাল সেনের শাসনামলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও সুদূরপ্রসারী ঘটনা হলো হিন্দু সমাজে বর্ণপ্রথার কঠোরতা বৃদ্ধি এবং ‘কৌলীন্য প্রথা’র প্রবর্তন। প্রাচীন বাংলার সমাজব্যবস্থায় বৌদ্ধ ধর্মের পতন এবং হিন্দু ধর্মের পুনরুত্থানের এই যুগে সমাজকে শাস্ত্রীয় নিয়মে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে তিনি ব্রাহ্মণ, বৈদ্য ও কায়স্থ সম্প্রদায়ের মধ্যে এই প্রথা চালু করেন। বিদ্যা, আচার, নিষ্ঠা ও সৎচরিত্রের মতো নির্দিষ্ট কিছু গুণের ভিত্তিতে সমাজের উচ্চবর্গীয়দের সামাজিক মর্যাদা বা ‘কৌলীন্য’ নির্ধারণ করা হয়েছিল। এই প্রথা বাংলার হিন্দু সমাজের বিবাহ, রীতিনীতি ও সামাজিক স্তরায়নে এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল।
একজন সুদক্ষ শাসক হওয়ার পাশাপাশি বল্লাল সেন ছিলেন একজন অসাধারণ পণ্ডিত ও সংস্কৃত সাহিত্যের একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক। তাঁর পাণ্ডিত্য ও শাস্ত্রজ্ঞানের প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর রচিত দুটি বিখ্যাত সংস্কৃত গ্রন্থ—’দানসাগর’ এবং ‘অদ্ভুতসাগর’ থেকে। স্মৃতিশাস্ত্র, আচার ও জ্যোতিষশাস্ত্রের ওপর রচিত এই গ্রন্থগুলো প্রাচীন বাংলার জ্ঞানচর্চার অমূল্য দলিল। তিনি শৈব মতে বিশ্বাসী ছিলেন এবং তাঁর গুরু ছিলেন প্রখ্যাত পণ্ডিত অনিরুদ্ধ ভাট্ট। বল্লাল সেনের এই অসামান্য পাণ্ডিত্য, সমাজ সংস্কার এবং হিন্দু ধর্মের প্রতি প্রবল আনুকূল্য সেন রাজবংশকে কেবল একটি রাজনৈতিক শক্তি থেকে প্রাচীন বাংলার সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রধান নিয়ামকে পরিণত করেছিল।