‘অবসরভাতা’ বা পেনশন (Pension) হলো এমন একটি আর্থিক ব্যবস্থা, যার অধীনে কোনো কর্মজীবী ব্যক্তি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন থেকে আনুষ্ঠানিক অবসরের পর নিয়মিত (সাধারণত মাসিক) একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রাপ্ত হন। এটি মূলত বৃদ্ধ বয়সে বা কর্মক্ষমতা হ্রাসের পর মানুষের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি। চাকরিজীবনে নির্দিষ্ট সময় ও শর্ত পূরণ করলে নিয়োগকর্তা বা রাষ্ট্র এই ভাতা প্রদান করে থাকে।
অবসরভাতার উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব
-
আর্থিক নিরাপত্তা: কর্মজীবন শেষে মানুষের নিয়মিত আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যায়। অবসরভাতা জীবনের শেষ দিনগুলোতে একটি স্থিতিশীল ও নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা দেয়।
-
চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ: বৃদ্ধ বয়সে মানুষের স্বাস্থ্যগত সমস্যা ও চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি পায়। পেনশনের অর্থ দিয়ে এই বর্ধিত ব্যয় সামলানো সহজ হয়।
-
স্বনির্ভরতা ও আত্মমর্যাদা: অবসরভাতা বৃদ্ধ বয়সে অন্যের (যেমন: সন্তানদের) উপর আর্থিক নির্ভরতা কমায় এবং ব্যক্তির আত্মমর্যাদা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
-
জীবনযাত্রার মান বজায় রাখা: অবসরের পূর্বে যে ধরনের জীবনযাত্রায় একজন ব্যক্তি অভ্যস্ত ছিলেন, তা অনেকাংশে বজায় রাখতে পেনশন একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
অবসরভাতার প্রধান প্রকারভেদ
প্রেক্ষাপট এবং কর্মক্ষেত্রের ওপর ভিত্তি করে অবসরভাতা বা পেনশন ব্যবস্থাকে সাধারণত কয়েকটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
- সরকারি পেনশন (Government Pension): এটি সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য। কর্মজীবন শেষে (সাধারণত ৫৯ বা ৬০ বছর বয়সে) সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে আজীবন এই ভাতা প্রদান করে থাকে। সরকারি পেনশনের ক্ষেত্রে সাধারণত শেষ আহরিত মূল বেতনের (Basic Salary) একটি নির্দিষ্ট শতাংশ পেনশন হিসেবে নির্ধারিত হয়।
- পারিবারিক পেনশন (Family Pension): পেনশনভোগী ব্যক্তির মৃত্যুর পর তাঁর জীবিত স্ত্রী/স্বামী বা নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে নির্ভরশীল সন্তান বা প্রতিবন্ধী সন্তানরা এই ভাতা পেয়ে থাকেন। এটি মৃত সরকারি কর্মচারীর পরিবারের আর্থিক সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যবস্থা।
- বেসরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক অবসর সুবিধা (Private/Corporate Pension): বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত আজীবন মাসিক পেনশন না দিলেও, ‘প্রভিডেন্ট ফান্ড’ (Provident Fund) বা ‘গ্র্যাচুইটি’ (Gratuity)-এর মাধ্যমে এককালীন একটি বড় অঙ্কের অর্থ অবসর সুবিধা হিসেবে প্রদান করে থাকে। তবে বর্তমানে কিছু বহুজাতিক বা বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব ট্রাস্ট ফান্ডের মাধ্যমে মাসিক পেনশন ব্যবস্থাও চালু রয়েছে।
- সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা (Universal Pension Scheme): যাঁরা সরকারি চাকরি করেন না, তাঁদের বৃদ্ধ বয়সের সুরক্ষার জন্য সরকার এই ব্যবস্থা চালু করে। বাংলাদেশে ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সর্বজনীন পেনশন স্কিম’ চালু করা হয়েছে। এর অধীনে ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী (বিশেষ শর্তে ৬০ বছর পর্যন্ত) যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিক নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা প্রদানের মাধ্যমে ৬০ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার পর আজীবন মাসিক পেনশন সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।
বাংলাদেশে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের প্রধান ধরনসমূহ
বাংলাদেশের সর্বজনীন পেনশন স্কিমকে সাধারণ নাগরিকদের পেশা ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে কয়েকটি স্কিমে ভাগ করা হয়েছে:
-
প্রবাস স্কিম: বিদেশে কর্মরত বা বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য।
-
প্রগতি স্কিম: বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চাকরিজীবীদের জন্য।
-
সুরক্ষা স্কিম: স্বকর্মে নিয়োজিত এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের (যেমন: কৃষক, রিকশাচালক, দোকানদার, শ্রমিক) জন্য।
-
সমতা স্কিম: অতিদরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য (এক্ষেত্রে সরকার মাসিক চাঁদার একটি নির্দিষ্ট অংশ ভর্তুকি হিসেবে প্রদান করে)।