স্কোয়াড্রন লিডার এম. হামিদুল্লাহ খান

স্কোয়াড্রন লিডার এম. হামিদুল্লাহ খান, বীর প্রতীক (১৯৩৮–২০১১) বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ১১নং সেক্টরের অন্যতম সাহসী অধিনায়ক এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন বিশিষ্ট কর্মকর্তা। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য নেতৃত্ব এবং সাহসিকতা তাঁকে মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে এক বিশেষ উচ্চতায় স্থান করে দিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে এবং তাঁর কর্মজীবনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলো নিবেদিত ছিল দেশের তরে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এম. হামিদুল্লাহ খান পাকিস্তান বিমানবাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং প্রথমে মুজিবনগর সরকারের অধীনে সংগঠিত বিভিন্ন অপারেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে যখন ১১নং সেক্টরের কমান্ডার মেজর আবু তাহের যুদ্ধে গুরুতর আহত হয়ে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে পড়েন, তখন স্কোয়াড্রন লিডার এম. হামিদুল্লাহ খান ১১নং সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১১নং সেক্টরের ভৌগোলিক সীমানা ছিল সমগ্র ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলা। এই সেক্টরে হাজার হাজার গেরিলা যোদ্ধা এবং নিয়মিত বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে অত্যন্ত জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ পরিচালনা করতে হতো। হামিদুল্লাহ খান দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এই বিশাল অঞ্চলের যোদ্ধাদের মনোবল অটুট রাখেন এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেন, যার ফলে তাঁর নেতৃত্বে ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল অঞ্চলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ এলাকা শত্রুমুক্ত হয়।

আরো পড়ুন:  শ্রীকর নন্দী

ডিসেম্বর মাসের শুরুতে তিনি তাঁর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের লক্ষ্যে অত্যন্ত কৌশলী আক্রমণ পরিচালনা করেন। তাঁর সামরিক দূরদর্শিতার কারণে ময়মনসিংহ ও এর আশেপাশের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিগুলো ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং তিনি তাঁর বাহিনীর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে শৃঙ্খলা ও সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব এবং সফল সামরিক নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত করে, যা ছিল তাঁর রণক্ষেত্রে অকুতোভয় সাহসের অনন্য স্বীকৃতি।

আরো পড়ুন:  ছুটিখান

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ছেড়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং দীর্ঘদিন সেনাবাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। সামরিক জীবন থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের মাঝে স্বাধীনতার চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ওপর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ও প্রবন্ধ রচনা করেছেন, যা মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সহায়ক। ২০১১ সালের ৫ মে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ৭৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এবং তাঁকে অত্যন্ত রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

আরো পড়ুন:  অধিনায়ক

স্কোয়াড্রন লিডার এম. হামিদুল্লাহ খান, বীর প্রতীক ছিলেন একাধারে একজন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা এবং একজন সুশৃঙ্খল সামরিক কর্মকর্তা। বাংলাদেশের উত্তর-মধ্যাঞ্চলের রণাঙ্গনে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এবং ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান জাতি চিরকাল গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।