প্রবাসজীবন চৌধুরী (জন্ম: ১৩ মার্চ ১৯১৬ – মৃত্যু: ৪ মে ১৯৬১) ছিলেন ভারতের একজন প্রখ্যাত বাঙালি দার্শনিক, সৌন্দর্যতত্ত্ব বিশারদ (Aesthetician), লেখক এবং অধ্যাপক। বিজ্ঞান ও দর্শনের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল তাঁর চিন্তা ও কর্মে। তুলনামূলক সৌন্দর্যতত্ত্ব এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দর্শন নিয়ে গভীর গবেষণার জন্য তিনি বাঙালি বিদ্বান সমাজে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
প্রবাসজীবন চৌধুরী ১৯১৬ সালের ১৩ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে বিজ্ঞানের ছাত্র এবং দর্শনের অনুরাগী।
-
১৯৩৯ সালে তিনি পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর (M.Sc.) ডিগ্রি লাভ করেন।
-
পরবর্তীতে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও সাহিত্য, দর্শন এবং নন্দনতত্ত্বের (Aesthetics) প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ ছিল, যা তাঁর পরবর্তী জীবনের গবেষণার মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।
কর্মজীবন ও দর্শন
কর্মজীবনে তিনি পদার্থবিদ্যা এবং দর্শন—উভয় বিষয়েই অধ্যাপনা করেছেন। তিনি বিখ্যাত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর চিন্তাধারার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল বিজ্ঞান এবং শিল্পের মধ্যে একটি দার্শনিক সেতুবন্ধন তৈরি করা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, বিজ্ঞানের সত্য এবং শিল্পের সৌন্দর্য—উভয়ই মূলত একই পরম সত্যের ভিন্ন ভিন্ন রূপ। তাঁর এই মতবাদ তাঁকে সমসাময়িক দার্শনিকদের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছিল।
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ও গবেষণা
প্রবাসজীবন চৌধুরী বাংলা এবং ইংরেজি দুই ভাষাতেই সমান দক্ষতায় লেখালেখি করেছেন। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে নন্দনতত্ত্ব এবং রবীন্দ্র-দর্শন বিষয়ক কাজগুলো সবচেয়ে বেশি সমাদৃত:
-
রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্য-দর্শন: এটি তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি কাজ, যেখানে তিনি বিশ্বকবির নন্দনতত্ত্বকে দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন।
-
সৌন্দর্যদর্শন: শিল্প ও সাহিত্যের সৌন্দর্য কীভাবে মানুষের মনকে প্রভাবিত করে, তা নিয়ে লেখা একটি আকর গ্রন্থ।
-
ঈশ্বর সন্ধানে: বিজ্ঞান ও দর্শনের আলোকে স্রষ্টা বা পরম সত্তার খোঁজ নিয়ে লেখা একটি মননশীল বই।
-
অভিযাত্রী: তাঁর লেখা আরেকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।
এছাড়া ইংরেজিতে তাঁর লেখা ‘Studies in Comparative Aesthetics’ এবং ‘Philosophy of Science’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দর্শনের পাঠকদের কাছে বেশ পরিচিত।
প্রয়াণ ও উত্তরাধিকার
১৯৬১ সালের ৪ মে মাত্র ৪৫ বছর বয়সে আকস্মিক ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে কলকাতার আইপিজিএমইআর (এসএসকেএম) হাসপাতালে এই প্রাজ্ঞ চিন্তাবিদের জীবনাবসান ঘটে।
তাঁর অকালমৃত্যু বাংলা দর্শন চর্চার ক্ষেত্রে একটি বড় ক্ষতি ছিল। তবে স্বল্পকালীন জীবনে তিনি নন্দনতত্ত্ব এবং রবীন্দ্র-দর্শনের যে তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রস্তুত করে দিয়ে গেছেন, তা আজও বাংলা ও ভারতের দর্শনশাস্ত্রের গবেষকদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।