ঠুংরি

ঠুংরি হলো হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং আবেগনির্ভর লঘু শাস্ত্রীয় (Semi-classical) ধারা। এর উৎপত্তি মূলত উত্তর ভারতে, বিশেষ করে লক্ষ্ণৌর রাজকীয় দরবারে। ঠুংরির মূল বৈশিষ্ট্য হলো এর কাব্যিক মাধুর্য, গায়কির আবেগ এবং রাগের শাস্ত্রীয় কঠোরতার পরিবর্তে ভাব বা রসের প্রাধান্য। এটি কেবল সুরের বিস্তার নয়, বরং বাণীর (গানের কথা) অন্তর্নিহিত ভাবকে ফুটিয়ে তোলার একটি শৈল্পিক প্রচেষ্টা।

ঠুংরির মূল বৈশিষ্ট্য ও দর্শন:

  • ভাবের প্রাধান্য: ঠুংরিতে রাগের নিয়ম-কানুন কিছুটা শিথিল থাকে। এখানে মূল লক্ষ্য থাকে গানের বাণীর মাধ্যমে মনের গভীরতম আবেগ—বিশেষ করে বিরহ, অভিমান বা ভক্তির প্রকাশ ঘটানো। তাই একে ‘ভাবপ্রধান’ সঙ্গীতও বলা হয়।

  • বিবর্তনের ধারা: ঠুংরির উৎপত্তিতে লখনৌয়ের নবাব ওয়াজেদ আলী শাহর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি সঙ্গীত ও নৃত্যকে যেভাবে সমন্বয় করেছিলেন, তাতে ঠুংরির আঙ্গিকটি এক বিশেষ রূপ লাভ করে। পরবর্তীকালে বেনারস ঘরানার প্রভাবে ঠুংরিতে আরও গভীরতা ও আধ্যাত্মিকতার স্পর্শ যুক্ত হয়।

  • গায়কি শৈলী: ঠুংরির গায়কির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘মীড়’ (এক সুর থেকে অন্য সুরে গড়িয়ে যাওয়া) এবং সূক্ষ্ম অলঙ্কার ব্যবহার। এতে গায়ক বা গায়িকা তাঁর নিজের আবেগের জায়গা থেকে সুরের বাঁক তৈরি করেন, যা প্রতিবার গাওয়ার সময় ভিন্ন ভিন্ন রূপ পেতে পারে।

বাংলা গানে ঠুংরির প্রয়োগ ও অতুলপ্রসাদ সেন: বাংলা সঙ্গীতে ঠুংরির চাল প্রথম সার্থকভাবে সংযোজন করেছিলেন অতুলপ্রসাদ সেন। তিনি জীবনের অনেকটা সময় লক্ষ্ণৌতে কাটিয়েছিলেন বলে সেখানের সাঙ্গীতিক আবহ তাঁর ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, বাংলা গানের সুরের বৈশিষ্ট্য রক্ষা করেও যদি হিন্দুস্থানি ঠুংরির কারুকাজ প্রয়োগ করা যায়, তবে তা বাংলা গানকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।

  • পরীক্ষা-নিরীক্ষা: অতুলপ্রসাদ বাংলা গানের সুর ও তালের মৌলিকতা বজায় রেখে ঠুংরি ও দাদরা ভঙ্গির সুর যুক্ত করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত গানগুলো যেমন—‘কি আর চাহিব বলো’ (টপ খেয়াল আঙ্গিকের), ‘ওগো নিঠুর দরদী’ (মিশ্র আশাবরী-দাদরা/টপ ঠুংরি) বা ‘যাব না যাব না ঘরে’ (ঠুংরি) বাংলা সঙ্গীতের জগতে এই নতুন শৈলীর সার্থক উদাহরণ।

  • নতুন দিগন্ত: অতুলপ্রসাদের এই প্রয়াস বাংলা গানকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কঠোর কাঠামোর বাইরে এনে এক বন্ধনমুক্ত শৈল্পিক আবহ দান করেছিল। তাঁর পথ ধরেই পরবর্তীকালে রাগপ্রধান ধারার বাংলা আধুনিক গান একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী অবস্থানে উন্নীত হয়।

ঠুংরির গুরুত্ব: বর্তমান আধুনিক সঙ্গীত চর্চায় ঠুংরি একটি অত্যন্ত মার্জিত ও উচ্চমানের ধারা হিসেবে বিবেচিত। এটি শ্রোতার মনে এক প্রশান্তির আবেশ তৈরি করে। যে কেউ যখন ঠুংরির সুর শোনে, সে সুরের জাদুতে লীন হয়ে যায়—এটিই এই গায়কী শৈলীর সবচেয়ে বড় সার্থকতা। ঠুংরি কেবল একটি সুরের নাম নয়, এটি সঙ্গীতের ভাষায় কথা বলার এক অনন্য শিল্প।

আপনি কি ঠুংরির বিভিন্ন ঘরানা—যেমন লখনৌ বা বেনারস ঘরানা—সম্পর্কে কিংবা অতুলপ্রসাদ সেনের গানের