ভুক্তভোগী

ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় ‘ভুক্তভোগী’ বা ‘ভিকটিম’ (Victim) হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি অপর কোনো ব্যক্তির দ্বারা সংঘটিত বেআইনি বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ফলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শারীরিক, মানসিক, বা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

যেকোনো ফৌজদারি অপরাধকে মূলত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। এ কারণেই ফৌজদারি মামলাগুলোতে রাষ্ট্র নিজেই বাদী বা প্রসিকিউটর হিসেবে আসামির বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করে। তবে এই সমগ্র বিচার প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন ভুক্তভোগী।

ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ায় একজন ভুক্তভোগীর আইনি অবস্থান, ভূমিকা এবং অধিকারগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১. বিচার প্রক্রিয়ার সূচনাকারী

বেশিরভাগ ফৌজদারি মামলার সূচনা হয় ভুক্তভোগীর মাধ্যমে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ভুক্তভোগী নিজেই থানায় গিয়ে ‘এজাহার’ (FIR) দায়ের করেন, তখন তাকে ‘সংবাদদাতা’ (Informant) বলা হয়। আর যদি তিনি সরাসরি আদালতে গিয়ে নালিশ করেন, তখন তাকে ‘বাদী’ (Complainant) বলা হয়।

২. প্রধান সাক্ষী (Prime Witness)

আদালতে বিচার চলাকালে ভুক্তভোগীই সাধারণত রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে গণ্য হন। তিনি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং সরাসরি ভুক্তভোগী হওয়ায় তার জবানবন্দি মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। আদালতে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবীর ‘জেরা’ (Cross-Examination) মোকাবিলা করে নিজের বক্তব্যে অবিচল থাকাই ভুক্তভোগীর সবচেয়ে বড় আইনি পরীক্ষা।

৩. ভুক্তভোগীর আইনি অধিকার

আধুনিক বিচারব্যবস্থায় আসামির অধিকারের পাশাপাশি ভুক্তভোগীর অধিকার সংরক্ষণের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে:

  • ন্যায়বিচার ও আইনি সহায়তা: রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো ভুক্তভোগীর পক্ষে মামলা পরিচালনা করে তাকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়া।
  • ক্ষতিপূরণ (Compensation): ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪৫ ধারা অনুযায়ী, আদালত আসামিকে যে অর্থদণ্ড বা জরিমানা করেন, তার সম্পূর্ণ বা অংশবিশেষ ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদানের নির্দেশ দিতে পারেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মতো বিশেষ আইনেও ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে।
  • সম্মান ও গোপনীয়তা (Privacy): বিশেষ করে ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির মতো স্পর্শকাতর মামলার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর নাম ও পরিচয় গোপন রাখা আইনের বাধ্যতামূলক বিধান। এসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর সম্মান রক্ষার্থে অনেক সময় সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করে রুদ্ধদ্বার কক্ষে বা ‘ইন-ক্যামেরা ট্রায়াল’ (In-camera trial) পদ্ধতিতে বিচার করা হয়।
  • নিরাপত্তা ও সুরক্ষা: মামলা চলাকালীন আসামিপক্ষ যেন ভুক্তভোগীকে কোনো ধরনের হুমকি, ভয়ভীতি বা প্রলোভন দেখাতে না পারে, সেজন্য পুলিশ ও আদালতের কাছে নিরাপত্তা চাওয়ার অধিকার ভুক্তভোগীর রয়েছে।

৪. সেকেন্ডারি ভিকটিমাইজেশন (Secondary Victimization)

বাস্তবতায় ভুক্তভোগীদের অনেক সময় এক চরম আইনি ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। মামলার দীর্ঘসূত্রিতা, বারবার আদালতে হাজিরা দেওয়া এবং বিশেষ করে আদালতে জেরার সময় আসামিপক্ষের আইনজীবীর তীক্ষ্ণ ও অনেক সময় আপত্তিকর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে গিয়ে ভুক্তভোগী মানসিকভাবে পুনরায় বিপর্যস্ত হন। অপরাধবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে ‘সেকেন্ডারি ভিকটিমাইজেশন’ বা দ্বিতীয়বারের মতো হয়রানি বলা হয়।

উপসংহার: একটি সুষ্ঠু বিচারব্যবস্থার মূল লক্ষ্যই হলো অপরাধীকে শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে ভুক্তভোগীর জীবনে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিকার করা। তদন্তকারী কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিচারক পর্যন্ত সবারই আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব হলো ভুক্তভোগীর প্রতি সংবেদনশীল আচরণ করা এবং তার ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করা।