বাংলাদেশের পপ ও ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে ‘সোলস’ (Souls) কেবল একটি ব্যান্ডের নাম নয়, এটি একটি জীবন্ত কিংবদন্তি এবং দেশের অনেক প্রথিতযশা শিল্পীর আঁতুড়ঘর বা ‘মিউজিক্যাল স্কুল’। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে সোলস বাংলাদেশের শ্রোতাদের একের পর এক কালজয়ী গান উপহার দিয়ে আসছে। ১৯৭২ সালে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে এই ব্যান্ডের জন্ম হয়। শুরুতে ব্যান্ডের নাম ছিল ‘সুরেকা’, পরে ১৯৭৩ সালে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘সোলস’। সাজেদ উল আলম ছিলেন ব্যান্ডের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। শুরুর দিকে তারা মূলত চট্টগ্রামের বিভিন্ন হোটেল এবং ক্লাবে ইংরেজি গান কভার করতেন।
সোলসকে বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ‘পাঠশালা’ বলা হয়, কারণ এই ব্যান্ডের হাত ধরেই দেশের শীর্ষস্থানীয় বহু মিউজিশিয়ানের ক্যারিয়ারের শুরু এবং বিকাশ ঘটেছে। যারা একসময় সোলসে ছিলেন এবং পরবর্তীতে নিজেদের আলাদা সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন তপন চৌধুরী, নকীব খান, কুমার বিশ্বজিৎ এবং আইয়ুব বাচ্চু। তপন চৌধুরী ছিলেন শুরুর দিকের অন্যতম প্রধান ভোকাল, যার কণ্ঠে ব্যান্ডের অনেক কালজয়ী গান জনপ্রিয়তা পায়। নকীব খান ছিলেন সোলসের প্রথম দিকের সুরকার ও কিবোর্ডিস্ট, যিনি পরবর্তীতে জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘রেনেসাঁ’ গঠন করেন। কুমার বিশ্বজিৎও একসময় সোলসের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তীতে সলো ক্যারিয়ারে দারুণ সাফল্য পান। ১৯৮০ সালে সোলসে লিড গিটারিস্ট হিসেবে যোগ দেন আইয়ুব বাচ্চু এবং টানা দশ বছর এই ব্যান্ডের সাথে যুক্ত থেকে সোলসের গানে এক নতুন রক স্বাদ যুক্ত করেন। আইয়ুব বাচ্চু সোলস ছেড়ে যাওয়ার পর পার্থ বড়ুয়া ব্যান্ডের হাল ধরেন এবং আজও নাসিম আলী খানের সাথে যৌথভাবে সোলসের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
সোলসের অ্যালবামগুলো বাংলাদেশের অডিও ইন্ডাস্ট্রিতে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত ‘সুপার সোলস’ ছিল ব্যান্ডের প্রথম অ্যালবাম এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম প্রথম পূর্ণাঙ্গ ব্যান্ড অ্যালবাম। এই অ্যালবামের অভাবনীয় সাফল্য দেশের ব্যান্ড মিউজিকের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এছাড়া ‘কলেজের করিডোরে’ (১৯৮৫), ‘মানুষ মাটির কাছাকাছি’ (১৯৮৭), ‘ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট’ (১৯৮৮), ‘এ এমন পরিচয়’ (১৯৯৩), ‘আজ দিন কাটুক গানে’ (১৯৯৫), ‘অসময়ের গান’ (১৯৯৭) এবং ‘মুখরিত জীবন’ (২০০০) এর মতো দারুণ সব জনপ্রিয় অ্যালবাম তারা উপহার দিয়েছে।
সোলসের গানে রোমান্টিকতা, মেলোডি এবং ব্লুজের এক অসাধারণ মিশ্রণ পাওয়া যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের মুখে মুখে ফেরা তাদের কিছু আইকনিক গান হলো মন শুধু মন ছুঁয়েছে, এ এমন পরিচয়, কেন এই নিঃসঙ্গতা, ব্যস্ততা দেয় না আমাকে অবসর, মুখরিত জীবন, সাগরের প্রান্তরে এবং আইয়ুব বাচ্চুর কণ্ঠে গাওয়া ‘একদিন ঘুমভাঙ্গা শহরে’। নানা সময়ে ব্যান্ডের লাইনআপে অনেক পরিবর্তন এলেও সোলস কখনোই থেমে থাকেনি। বর্তমানে পার্থ বড়ুয়া ও নাসিম আলী খানের নেতৃত্বে সোলস দেশে এবং দেশের বাইরে নিয়মিত কনসার্ট করে যাচ্ছে। মেলোডিয়াস পপ-রক ধারার গানে সোলস আজও বাংলা ভাষাভাষী শ্রোতাদের কাছে এক দারুণ আবেগের নাম।