জয়নুদ্দিন আহমদ খান

জয়নুদ্দিন আহমদ খান (১৭৪৮ সালে মৃত্যু), যিনি হায়বত জং নামেও পরিচিত ছিলেন, ছিলেন বাংলার নবাব আলীবর্দী খানের জামাতা এবং বিহারের নায়েব নাজিম (উপ-গভর্নর)। তিনি নবাব সিরাজউদ্দৌলার পিতা হিসেবে ইতিহাসে বিশেষভাবে পরিচিত।

নিচে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

ব্যক্তিগত পরিচয় ও পটভূমি

  • জন্ম ও নাম: তার প্রকৃত নাম ছিল মির্জা মুহাম্মদ হাশিম। তিনি ছিলেন নবাব আলীবর্দী খানের অগ্রজ হাজী আহমদের কনিষ্ঠ পুত্র।

  • উপাধি: নবাব সুজাউদ্দীন খানের শাসনামলে তিনি ‘খান’ উপাধি লাভ করেন। পরবর্তীতে আলীবর্দী খান বাংলার নবাব হওয়ার পর তাকে বিহারের নায়েব নাজিম নিযুক্ত করেন এবং তিনি ‘হায়বত জং’ উপাধি ধারণ করেন।

  • পারিবারিক সম্পর্ক: তিনি আলীবর্দী খানের সর্বকনিষ্ঠা কন্যা আমিনা বেগমকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির সন্তানই ছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা।

প্রশাসনিক অবদান

নবাব আলীবর্দী খানের শাসনামলে জয়নুদ্দিন আহমদ খান তার ভাই নওয়াজিশ মুহাম্মদ খান ও সাঈদ আহমদ খানের মতো অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রশাসন পরিচালনা করেন। তিনি আলীবর্দী খানের বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে বিহারের শাসনভার গ্রহণ করেন এবং অত্যন্ত সুচারুভাবে প্রদেশটি পরিচালনা করেন।

মারাঠা ও আফগান বিদ্রোহ দমন

জয়নুদ্দিন আহমদ খানের শাসনকাল ছিল চরম অস্থিরতার—বিশেষ করে মারাঠা ও বিদ্রোহী আফগান সৈন্যদের আক্রমণের কারণে।

  • মুস্তফা খানের বিদ্রোহ: আফগান জেনারেল মুস্তফা খান বিহারের গভর্নর পদ না পেয়ে বিদ্রোহ করেন এবং পাটনা আক্রমণ করেন। জয়নুদ্দিন অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে প্রথম পর্যায়ে এই বিদ্রোহ প্রতিহত করেন। পরবর্তীতে নবাব আলীবর্দী খান সসৈন্যে বিহারে পৌঁছে বিদ্রোহীদের রাজ্যছাড়া করেন।

  • আফগান আক্রমণ প্রতিহত: মুস্তফা খান পুনরায় বিহার আক্রমণ করলে জয়নুদ্দিন তাকে প্রতিহত করেন এবং সেই যুদ্ধে মুস্তফা খান নিহত হন।

মৃত্যু ও ট্র্যাজেডি

১৭৪৮ সালে ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত থেকে আহমদ শাহ দুররানির আক্রমণের খবর ছড়িয়ে পড়লে বিহারের বিদ্রোহী আফগান সৈন্যরা উৎসাহিত হয়ে ওঠে। তারা আলীবর্দী খানকে ক্ষমতাচ্যুত করে পূর্ব ভারতে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে। এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে বিদ্রোহী আফগানরা পাটনা শহর দখল করে নেয় এবং ১৭৪৮ সালে জয়নুদ্দিন আহমদ খানকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।

তার মৃত্যুর সংবাদে শোকাহত নবাব আলীবর্দী খান দ্রুত বিহারে অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি কঠোর হস্তে এই বিদ্রোহ দমন করেন এবং জয়নুদ্দিনের বিধবা স্ত্রী আমিনা বেগম এবং তাদের দুই পুত্র—সিরাজউদ্দৌলা ও মির্জা মেহেদীকে উদ্ধার করেন।

জয়নুদ্দিন আহমদ খানের মৃত্যু বাংলার নবাবী আমলে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছিল এবং এটি ছিল নবাব আলীবর্দী খানের শাসনামলের অন্যতম দুঃখজনক অধ্যায়।