‘সমাজতান্ত্রিক’ (Socialist) শব্দটি মূলত ‘সমাজতন্ত্র’ (Socialism) নামক একটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক মতাদর্শ ও শাসনব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত। সমাজতন্ত্র এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে উৎপাদনের প্রধান মাধ্যমসমূহ (যেমন: কলকারখানা, জমি, খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ) ব্যক্তিগত বা বেসরকারি মালিকানার পরিবর্তে সরকার, রাষ্ট্র বা সমাজের যৌথ মালিকানায় ও নিয়ন্ত্রণে থাকে। এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা, মুনাফাকেন্দ্রিক শোষণের অবসান ঘটানো এবং শ্রেণিবৈষম্য দূর করে একটি সাম্যভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা।
মূল নীতি ও বৈশিষ্ট্য
সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা পুঁজিবাদী (Capitalist) ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত একটি ধারণা। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
-
যৌথ বা রাষ্ট্রীয় মালিকানা: সম্পদে ব্যক্তিগত মালিকানার অধিকার অত্যন্ত সীমিত থাকে এবং মূল অর্থনৈতিক খাতগুলো রাষ্ট্র পরিচালনা করে।
-
পরিকল্পিত অর্থনীতি: মুক্তবাজার ব্যবস্থার (Free Market) পরিবর্তে এখানে ‘কেন্দ্রীয় পরিকল্পিত অর্থনীতি’ (Centrally Planned Economy) কাজ করে। রাষ্ট্র নির্ধারণ করে কী উৎপাদিত হবে, কতটুকু উৎপাদিত হবে এবং কীভাবে বণ্টন করা হবে।
-
সুষম বণ্টন ও সমতা: “প্রত্যেকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করবে এবং প্রত্যেকে তার প্রয়োজন অনুযায়ী পাবে”—এটি সমাজতন্ত্রের একটি মৌলিক স্লোগান। সমাজের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক চাহিদা (অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা) নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়।
-
শ্রেণিহীন সমাজের আকাঙ্ক্ষা: পুঁজিপতি (মালিক) এবং সর্বহারা (শ্রমিক)—এই দুই শ্রেণির মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও বৈষম্য দূর করে একটি শোষণমুক্ত সমাজ গঠন করা এর চূড়ান্ত লক্ষ্য।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বিকাশ
ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের ফলে পুঁজিপতিদের হাতে সম্পদের পাহাড় জমতে থাকে এবং শ্রমিক শ্রেণির চরম দুর্দশা দেখা দেয়। এই অমানবিক শোষণের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই আধুনিক সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার উদ্ভব ঘটে। জার্মান দার্শনিক কার্ল মার্ক্স (Karl Marx) এবং ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস (Friedrich Engels) তাঁদের যুগান্তকারী প্রকাশনা ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’ (The Communist Manifesto, ১৮৪৮) এবং ‘দাস ক্যাপিটাল’ (Das Kapital)-এর মাধ্যমে সমাজতন্ত্রকে একটি সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদান করেন।
পরবর্তীতে ১৯১৭ সালে ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় ঐতিহাসিক বলশেভিক বিপ্লবের মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’ (USSR) প্রতিষ্ঠিত হয়।
স্নায়ুযুদ্ধ এবং ‘দ্বিতীয় বিশ্ব’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তার মিত্র পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক আদর্শে পরিচালিত দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে সম্মিলিতভাবে ‘দ্বিতীয় বিশ্ব’ (Second World) হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো। স্নায়ুযুদ্ধের (Cold War) দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই সমাজতান্ত্রিক ব্লকটি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী ‘প্রথম বিশ্ব’-এর প্রধান আদর্শিক, রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিপক্ষ হিসেবে অবস্থান করেছিল।
বর্তমান প্রেক্ষাপট
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক সরকারগুলোর পতনের পর ধ্রুপদী বা বিশুদ্ধ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিশ্বব্যাপী প্রভাব বহুলাংশে হ্রাস পায়।
বর্তমানে চীন, কিউবা, ভিয়েতনাম এবং লাওস নিজেদের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করলেও, এরা বৈশ্বিক বাস্তবতার সাথে তাল মেলাতে অর্থনীতিতে ব্যাপক সংস্কার এনেছে। বিশেষ করে চীন রাজনৈতিকভাবে কমিউনিস্ট দলের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখলেও অর্থনীতিতে পুঁজিবাদী মুক্তবাজার ব্যবস্থার ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে, যাকে তারা “চীনা বৈশিষ্ট্যের সমাজতন্ত্র” (Socialism with Chinese characteristics) বলে অভিহিত করে।
অন্যদিকে, নরওয়ে, সুইডেন বা ডেনমার্কের মতো স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে পুঁজিবাদী কাঠামোর ভেতরেই সমাজতান্ত্রিক নীতির (যেমন: অবৈতনিক শিক্ষা, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা এবং শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী) সফল প্রয়োগ দেখা যায়, যা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র’ (Democratic Socialism) বা সোস্যাল ডেমোক্রেসি নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত ও প্রশংসিত।