দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯, ১৯৪৫) মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক বৈশ্বিক সামরিক সংঘাত। ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর পোল্যান্ডে জার্মানির অতর্কিত আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের সূচনা ঘটে এবং ১৯৪৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর জাপানের আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের মাধ্যমে এর সমাপ্তি ঘটে। এই যুদ্ধে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রধান দেশ ও পরাশক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছিল এবং পুরো বিশ্ব মূলত দুটি বৃহৎ সামরিক জোটে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। এই জোট দুটির একটি ছিল নাৎসি জার্মানি, ফ্যাসিবাদী ইতালি এবং সাম্রাজ্যবাদী জাপানের নেতৃত্বাধীন ‘অক্ষশক্তি’। অন্যদিকে তাদের মোকাবিলায় গ্রেট ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং চীনের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল ‘মিত্রশক্তি’।

এই ভয়াবহ যুদ্ধের পেছনে বেশ কিছু সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক কারণ নিহিত ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির ওপর চাপিয়ে দেওয়া অপমানজনক ও কঠোর ভার্সাই চুক্তি জার্মানদের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। সেই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে জার্মানিতে এডলফ হিটলারের নাৎসিবাদের এবং ইতালিতে বেনিতো মুসোলিনির ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটে। তাদের উগ্র জাতীয়তাবাদী ও সম্প্রসারণবাদী নীতি বিশ্বশান্তিকে ভয়াবহ হুমকির মুখে ফেলে দেয়। পাশাপাশি এশিয়ায় জাপানের আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদ পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বশান্তি বজায় রাখার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘লীগ অফ নেশনস’ বৃহৎ শক্তিগুলোর এসব আগ্রাসন ঠেকাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

যুদ্ধের সময়কালটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে বেশ কিছু চরম মর্মান্তিক ও ধ্বংসাত্মক ঘটনার সাক্ষী হয়। হিটলারের নির্দেশে নাৎসি বাহিনী অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে প্রায় ৬০ লাখ ইহুদি এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে, যা ইতিহাসে ‘হলোকাস্ট’ নামে পরিচিত। ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন নৌঘাঁটি পার্ল হারবারে জাপানের অতর্কিত হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র মিত্রশক্তির পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে যোগ দিলে যুদ্ধের মোড় ঘুরতে শুরু করে। ১৯৪২-১৯৪৩ সালে স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে জার্মান বাহিনীর শোচনীয় পরাজয় এবং ১৯৪৪ সালে ফ্রান্সের উপকূলে মিত্রবাহিনীর বিশাল সফল অভিযান (নরম্যান্ডি অভিযান বা ডি-ডে) জার্মানির চূড়ান্ত পতন ত্বরান্বিত করে। অবশেষে ১৯৪৫ সালের আগস্টে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে ইতিহাসের প্রথম ও একমাত্র পারমাণবিক বোমা হামলা চালালে জাপান নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল ও প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী, যা পুরো বিশ্বব্যবস্থাকে চিরতরে বদলে দেয়। সামরিক ও বেসামরিক মিলিয়ে এই যুদ্ধে প্রায় ৭ থেকে ৮ কোটি মানুষ প্রাণ হারায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপ তাদের বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃত্ব হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের দুটি নতুন পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়, যা পরবর্তীকালে বিশ্বব্যাপী ‘স্নায়ুযুদ্ধ’-এর জন্ম দেয়। ভবিষ্যতে এমন ভয়াবহ যুদ্ধ এড়াতে এবং বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৪৫ সালে গঠিত হয় ‘জাতিসংঘ’। এছাড়া এই যুদ্ধের পর থেকেই বিশ্বজুড়ে উপনিবেশবাদের পতন ব্যাপকভাবে ত্বরান্বিত হয় এবং এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশ দীর্ঘ পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতা লাভ করতে শুরু করে।