কেশব সেন

কেশব সেন ছিলেন প্রাচীন বাংলার সেন রাজবংশের শেষ পর্বের একজন শাসক। তিনি ছিলেন সেন সাম্রাজ্যের পরাক্রমশালী রাজা লক্ষ্মণ সেনের পুত্র এবং বিশ্বরূপ সেনের কনিষ্ঠ ভ্রাতা। পিতা লক্ষ্মণ সেন এবং জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বিশ্বরূপ সেনের মৃত্যুর পর তিনি পূর্ব বাংলার (বিক্রমপুর) সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং সেন বংশের শাসন অব্যাহত রাখেন।

শাসনকাল ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে বখতিয়ার খলজির আক্রমণের ফলে সেনদের রাজধানী নদিয়া ও উত্তর বাংলা মুসলিম অধিকারে চলে যায়। তবে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা সেনদের দখলেই ছিল। বিশ্বরূপ সেনের পর আনুমানিক ১২২০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কেশব সেন স্বাধীনভাবে এই অঞ্চল শাসন করেন বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার মতো তিনিও মুসলিম বাহিনীর (যাঁদের তাম্রশাসনে ‘যবন’ বা ‘গর্গযবন’ বলা হয়েছে) আগ্রাসন সাফল্যের সাথে প্রতিহত করে পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।

ঐতিহাসিক উৎস: ইদিলপুর তাম্রশাসন

কেশব সেনের রাজত্বকাল সম্পর্কে জানার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হলো তাঁর নিজস্ব ‘ইদিলপুর তাম্রশাসন’। বর্তমান বাংলাদেশের শরীয়তপুর জেলার ইদিলপুর পরগনায় প্রাপ্ত এই তাম্রশাসন থেকে তাঁর রাজ্যের বিস্তৃতি, শাসনব্যবস্থা, ব্রাহ্মণদের ভূমিদান এবং তাঁর বীরত্বের বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়।

রাজকীয় উপাধি ও ধর্মীয় বিশ্বাস

  • উপাধি: সেন সাম্রাজ্যের বড় অংশ হাতছাড়া হয়ে গেলেও কেশব সেন তাঁর পূর্বসূরিদের মতোই অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণ রাজকীয় উপাধি ধারণ করেছিলেন। তাম্রশাসনে তাঁকে ‘গৌড়েশ্বর’ এবং ‘অরিরাজ-মর্দন-শঙ্কর’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে, যা তাঁর রাজকীয় দম্ভ এবং শত্রুদের (বিশেষত মুসলিম আক্রমণকারীদের) প্রতি তাঁর কঠোর অবস্থান নির্দেশ করে।

  • ধর্মীয় বিশ্বাস: পিতা লক্ষ্মণ সেন বৈষ্ণব হলেও কেশব সেন জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বিশ্বরূপ সেনের মতো সৌর বা সূর্যদেবের উপাসক ছিলেন। তবে সেন বংশের ঐতিহ্য মেনে তিনি হিন্দু ধর্মের অন্যান্য দেব-দেবীর প্রতিও শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং তাঁর সময়েও সংস্কৃত ভাষা ও ব্রাহ্মণদের পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত ছিল।

সেন বংশের অবসান

কেশব সেনকেই সেন রাজবংশের সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য ও স্বাধীন শাসক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর রাজত্বকালের পর সেন বংশের ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। কেশব সেনের পর মধু সেন ও শূর সেন নামের আরও দু-একজন শাসকের নাম ইতিহাসে বিক্ষিপ্তভাবে পাওয়া গেলেও, ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পূর্ববঙ্গে দেব রাজবংশের উত্থান এবং পরবর্তীতে সম্পূর্ণ বাংলায় মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাধ্যমে প্রাচীন বাংলার ইতিহাস থেকে সেন রাজবংশের চূড়ান্ত পতন ঘটে।