উচ্চাঙ্গনৃত্য

উচ্চাঙ্গনৃত্য বলতে প্রধানত ভরতনাট্যম, কথাকলি, কত্থক, ওড়িশি এবং মণিপুরী নৃত্যকে বোঝায়। প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন মন্দিরে দেবদেবীর ভাস্কর্য এবং ঐতিহাসিক তথ্য থেকে এই ধ্রুপদী নৃত্যকলার সৃষ্টি হয়েছে। বহু শতকের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এটি একটি অপূর্ব শিল্পে পরিণত হয়েছে। এই নৃত্যের নানা কৌশল, মুদ্রা, রসতত্ত্ব ও নিয়মকানুন প্রাচীন মুনি ভরতের ‘নাট্যশাস্ত্র’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ রয়েছে। নাট্যশাস্ত্রে শৃঙ্গার, হাস্য, করুণ, বীর, ভয়ানক, রৌদ্র, বীভৎস, অদ্ভুত এবং শান্ত, এই নবরসের উল্লেখ আছে। রস ও ব্যঞ্জনা হলো এই নৃত্যকলার প্রধান অঙ্গ।

ব্রিটিশ শাসনামলে এই ধ্রুপদী নৃত্যের শৈল্পিক মাধুর্য অনেকটা কমে গিয়েছিল। তখন পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে ভারতীয় উচ্চাঙ্গনৃত্য এক নতুন রূপ লাভ করে, যা সেকালের রাজা মহারাজা এবং নবাব জমিদারদের জলসাঘরে প্রচলিত ছিল। এই নৃত্য ‘বাইজি নৃত্য’ নামে বেশি পরিচিত ছিল এবং প্রধানত কলকাতা ও লক্ষ্ণৌ শহরে এর ব্যাপক চর্চা হতো। পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই অবক্ষয় বুঝতে পেরে নৃত্যের ক্ষেত্রে নতুন চেতনার উন্মেষ ঘটান এবং উদয়শঙ্কর ভারতীয় নৃত্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। তাঁদের একক প্রচেষ্টায় এই ধ্রুপদী শিল্প নতুন জীবন লাভ করে।

বাংলাদেশে উচ্চাঙ্গনৃত্যের চর্চা

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে, বর্তমান বাংলাদেশে, মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চল হওয়ায় নৃত্যকলায় একটি বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি হয়। এই সময়ে প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরীর একান্ত সাধনায় নৃত্য আবার নতুন রূপ পায়। তিনি ভরতনাট্যম, কথাকলি এবং কত্থকের ঢঙে নিজস্ব ধারায় বহু নৃত্য তৈরি করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকা এই সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে প্রচলিত উচ্চাঙ্গনৃত্যগুলোর মধ্যে কত্থক অত্যন্ত জনপ্রিয়। এছাড়া ভরতনাট্যম, মণিপুরী এবং ওড়িশি নৃত্যের চর্চাও ঢাকা শহরের সুধীসমাজে বেশ সমাদৃত। তবে বাংলাদেশে কথাকলি নৃত্যের চর্চা তেমন একটা দেখা যায় না।

ভরতনাট্যম

ভরতমুনির নামানুসারে প্রচলিত ভরতনাট্যম দক্ষিণ ভারতের একটি প্রাচীন নৃত্য। ভাব, রস এবং তালের অপূর্ব সমন্বয় এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই নৃত্যে শিল্পীর নানা অভিব্যক্তি বিভিন্ন মুদ্রার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। দৃষ্টি নিক্ষেপের মাধ্যমে লজ্জা ও উপেক্ষা, ভ্রূক্ষেপের মাধ্যমে ভয় ও সন্দেহসহ মনের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে। এই নৃত্যে অতিরিক্ত লম্ফঝম্প বা শরীর ঝাঁকুনির কোনো সুযোগ নেই, সবকিছুই খুবই পরিমিত ও মার্জিত। আলারিপ্পু, যতিস্বরম, শব্দম, বর্ণম, পদম, তিল্লানা, শ্লোকম এবং অভিনয়ম, এই আটটি প্রধান পর্যায়ে ভরতনাট্যম পরিবেশিত হয়।

কথাকলি

কথাকলি দক্ষিণ ভারতের কেরালা অঞ্চলের একটি অত্যন্ত বর্ণাঢ্য এবং নাটকীয় নৃত্য। এর মূল উৎস ছিল প্রাচীনকালের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা এবং যুদ্ধবিদ্যা শেখার আখড়া বা কালারীর দৈহিক কসরত। এটি মূলত একটি নৃত্যনাট্য, যেখানে বিভিন্ন চরিত্র নাটকীয়ভাবে নানা পৌরাণিক কাহিনী তুলে ধরে। কথাকলি সাধারণত পুরুষরাই পরিবেশন করে থাকেন এবং নারী চরিত্রেও পুরুষরাই অভিনয় করেন। শিল্পীর মুখে নানা রঙের জটিল নকশা, বিশাল মুকুট এবং জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক এই নৃত্যের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

কত্থক

উত্তর ভারতের লক্ষ্ণৌ এবং জয়পুর অঞ্চলে কত্থক নৃত্যের উদ্ভব হয়। কত্থক শব্দটি ‘কথা’ বা গল্প বলা থেকে এসেছে। মুঘল বাদশাহদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই নৃত্য ব্যাপক প্রসার লাভ করে। শিল্পীরা নতুন নতুন ছন্দ, লয় এবং তাল উদ্ভাবন করে এই নৃত্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলেন। অযোধ্যার নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ এই নৃত্যের একজন বড় অনুরাগী ছিলেন। কত্থক নৃত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো পায়ের দ্রুত ও জটিল কাজ এবং ঘূর্ণায়মান দৈহিক ভঙ্গি। তবলা ও পাখোয়াজের তালের সাথে সাথে এটি অত্যন্ত প্রাণবন্তভাবে পরিবেশিত হয়।

মণিপুরী নৃত্য

ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে এই নৃত্যের সৃষ্টি। মণিপুরী নৃত্য প্রধানত হিন্দুধর্ম এবং রাধা কৃষ্ণের রাসলীলা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। মণিপুরীরা খুবই সহজ সরল ও ভক্তিপরায়ণ, তাই তাদের নৃত্যও অত্যন্ত কোমল ও মধুর। এই নৃত্যে খোল এবং করতাল বাজিয়ে কীর্তনের সুরে ভক্তিরস ফুটিয়ে তোলা হয়। মণিপুরী নৃত্যের পোশাক খুবই আকর্ষণীয়, বিশেষ করে মেয়েদের ঘাগরা কাঁচ ও নানা উজ্জ্বল নকশায় পূর্ণ থাকে।

ওড়িশি নৃত্য

ওড়িশি ভারতের উড়িষ্যা প্রদেশের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য। উড়িষ্যার প্রাচীন মন্দিরগুলোর ভাস্কর্যে এই নৃত্যের অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। এই নৃত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর অনুপম ভঙ্গি এবং ভাস্কর্যসুলভ সৌন্দর্য। চৌক এবং ত্রিভঙ্গ, এই দুটি মূল শারীরিক ভঙ্গিমার ওপর ভিত্তি করে ওড়িশি নৃত্য পরিবেশিত হয়। ত্রিভঙ্গিতে মাথা, কোমর এবং নিতম্ব বিপরীত দিকে সামান্য বাঁকানো থাকে, যা দেখতে অত্যন্ত লাবণ্যময়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পণ্ডিত কেলুচরণ মহাপাত্রের মতো গুণী শিল্পীদের ঐকান্তিক চেষ্টায় এই নৃত্য তার বর্তমান গৌরব ফিরে পায়।