ওড়িশি নৃত্য (Odissi) ভারতের আটটি প্রধান ধ্রুপদী বা ক্লাসিক্যাল নৃত্যশৈলীর মধ্যে অন্যতম। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ওড়িশার হিন্দু মন্দিরগুলো থেকে, বিশেষ করে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরকে কেন্দ্র করে এই নৃত্যের উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটে। অত্যন্ত মোহনীয় ও লাবণ্যময় এই নৃত্যশৈলী তার ভাস্কর্যসুলভ ভঙ্গি এবং গভীর আধ্যাত্মিক ভাবের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
নিচে ওড়িশি নৃত্যের বিভিন্ন দিক বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
ঐতিহাসিক পটভূমি
-
প্রাচীনত্ব: ভরত মুনির প্রাচীন গ্রন্থ ‘নাট্যশাস্ত্র’-এ উল্লিখিত ‘ওড্র মাগধী’ শৈলী থেকে ওড়িশি নৃত্যের উদ্ভব বলে অনেক পন্ডিত মনে করেন। ওড়িশার উদয়গিরি-খন্ডগিরি গুহা এবং কোণার্কের সূর্য মন্দিরের গায়ে খোদাই করা প্রাচীন ভাস্কর্যগুলোতে এই নৃত্যের বিভিন্ন ভঙ্গি দেখতে পাওয়া যায়।
-
মাহারী ও গোটিপুয়া প্রথা: প্রাচীনকালে মন্দিরের দেবদাসীরা (যাঁদের ওড়িশায় ‘মাহারী’ বলা হতো) দেবতাদের সন্তুষ্টির জন্য এই নৃত্য পরিবেশন করতেন। পরবর্তীতে ‘গোটিপুয়া’ (নারী বেশে সজ্জিত কমবয়সী ছেলে) প্রথার মাধ্যমে এই নৃত্য মন্দিরের বাইরে জনসমক্ষে আসে।
-
পুনর্জাগরণ: ব্রিটিশ শাসনামলে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এই নৃত্যকলা প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে গিয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র, গুরু পঙ্কজ চরণ দাস এবং গুরু দেবপ্রসাদ দাসের মতো গুণী শিল্পীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এটি তার হারানো গৌরব ফিরে পায়।
প্রধান বৈশিষ্ট্য
ওড়িশি নৃত্য তার শারীরিক ভঙ্গিমার জন্য অন্যান্য ধ্রুপদী নৃত্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
-
ত্রিভঙ্গ (Tribhangi): এটি ওড়িশি নৃত্যের সবচেয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। এতে নর্তকীর শরীর মাথা, বুক এবং কোমর—এই তিনটি অংশে বিপরীত দিকে সামান্য বাঁকানো থাকে। এই ভঙ্গিটি দেখতে অনেকটা ইংরেজি ‘S’ অক্ষরের মতো হয়।
-
চৌক (Chouka): এটি একটি বর্গাকার বা চারকোনা ভঙ্গি, যেখানে শরীরের ভার দুই পায়ের ওপর সমানভাবে থাকে। এই ভঙ্গিটি মূলত ভগবান জগন্নাথের রূপকে প্রতিফলিত করে।
-
ভাব ও বিষয়বস্তু: ওড়িশি নৃত্যের মূল উপজীব্য হলো বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্ব। বিশেষ করে ১২ শতকের কবি জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ’ অবলম্বনে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা এবং জগন্নাথ দেবের বন্দনা এই নৃত্যে ব্যাপকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়।
নৃত্যের পর্যায়ক্রম (Repertoire)
একটি ঐতিহ্যবাহী ওড়িশি নৃত্য পরিবেশনা সাধারণত কয়েকটি নির্দিষ্ট ধাপে সম্পন্ন হয়:
- মঙ্গলাচরণ: এটি পরিবেশনার শুরু। এতে ভূমি প্রণাম করা হয় এবং সাধারণত বিঘ্ননাশক ভগবান গণেশ বা অন্য কোনো দেবতার আরাধনা করা হয়।
- বটু নৃত্য বা স্থায়ী: এটি মূলত বিশুদ্ধ নৃত্য বা ‘নৃত্ত’। এতে কোণার্ক বা অন্যান্য মন্দিরের গায়ে খোদাই করা ভাস্কর্যের ভঙ্গিগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়।
- পল্লবী: ‘পল্লবী’ শব্দের অর্থ প্রস্ফুটিত হওয়া। এই পর্যায়ে ধীর লয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে চোখের দৃষ্টি, ঘাড়ের নড়াচড়া এবং পায়ের কাজের মাধ্যমে সুর ও তালের দ্রুত বিস্তার ঘটানো হয়।
- অভিনয়: এই ধাপে হাতের মুদ্রা ও মুখভঙ্গির মাধ্যমে কোনো পৌরাণিক গল্প বা কবিতার (যেমন গীতগোবিন্দ) ভাব ফুটিয়ে তোলা হয়।
- মোক্ষ: এটি নৃত্যের চূড়ান্ত পর্যায়। দ্রুত তালের মাধ্যমে আত্মিক মুক্তির আনন্দ প্রকাশ করে পরিবেশনার সমাপ্তি টানা হয়।
পোশাক ও সাজসজ্জা
ওড়িশি নৃত্যের সাজসজ্জা অত্যন্ত মোহনীয় এবং ঐতিহ্যবাহী:
-
শাড়ি: নৃত্যশিল্পীরা ওড়িশার ঐতিহ্যবাহী রেশম বা সিল্কের শাড়ি পরেন (যেমন—সম্বলপুরী বা বোমকাই শাড়ি), যা বিশেষ কায়দায় পরা হয় যাতে পায়ের নড়াচড়া সহজ হয়।
-
গয়না: এই নৃত্যে ব্যবহৃত গয়নাগুলো সম্পূর্ণ রূপার তৈরি। ওড়িশার বিখ্যাত তারকশি (Tarakasi) বা রূপার সূক্ষ্ম কাজের গয়না (মাথা, কান, গলা এবং কোমরের অলংকার) ব্যবহার করা হয়।
-
বিশেষ অঙ্গসজ্জা: মাথায় শোলার তৈরি সাদা ফুলের মুকুট পরা হয়, যাকে ‘তহিয়া’ বলা হয়। এছাড়া হাতে ও পায়ে লাল আলতা এবং পায়ে ঘুঙুর পরা বাধ্যতামূলক।
ওড়িশি নৃত্য কেবল একটি পরিবেশনা শিল্প নয়, এটি ভক্তি, সুর এবং শারীরিক কাব্যের এক অপূর্ব সমন্বয়।