ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজী (যাঁকে সাধারণত বখতিয়ার খলজী নামে অভিহিত করা হয়) ছিলেন একজন তুর্কি-আফগান সামরিক সেনাপতি এবং সামরিক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন অকুতোভয় যোদ্ধা। তিনি ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষ করে বাংলা ও বিহার অঞ্চলে, মুসলিম সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের অন্যতম প্রধান রূপকার। ত্রয়োদশ শতাব্দীর একেবারে সূচনা লগ্নে তাঁর বাংলা বিজয়ের মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলে হিন্দু ও বৌদ্ধ রাজত্বের অবসান ঘটে এবং মুসলিম শাসনের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়, যা পরবর্তী প্রায় কয়েক শতাব্দী ধরে বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল [Minhaj-i-Siraj, Tabaqat-i-Nasiri]। বখতিয়ার খলজীর এই বিজয় কেবল ক্ষমতার পালাবদল ছিল না, বরং এটি ছিল বাংলার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী বাঁক, যার ফলশ্রুতিতে এই অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের প্রসার, সুফি সাধকদের আগমন এবং একটি নতুন মিশ্র সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটেছিল।
প্রাথমিক জীবন ও বংশপরিচয়
বখতিয়ার খলজী বর্তমান আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত ‘গরমশির’ বা দশত-ই-মার্গ এলাকার অধিবাসী ছিলেন। তিনি জাতিতে ছিলেন তুর্কি, কিন্তু দীর্ঘকাল আফগানিস্তানে বসবাসের কারণে তাঁরা আফগান সংস্কৃতি ও জীবনধারার সাথে মিশে গিয়েছিলেন। তাঁর গোত্রের নাম ছিল ‘খলজ’ বা ‘খলজী’ [Eaton, The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1993]। বখতিয়ার খলজীর প্রাথমিক জীবন খুব একটা সুখকর ছিল না। ইতিহাসবিদ মিনহাজ-উস-সিরাজ তাঁর ‘তবকাত-ই-নাসিরী’ গ্রন্থে বখতিয়ারের শারীরিক গঠনের একটি অদ্ভুত বর্ণনা দিয়েছেন। বলা হয়, তাঁর হাত দুটি অস্বাভাবিক লম্বা ছিল, যা তাঁর হাঁটু পর্যন্ত পৌঁছাত এবং তিনি ছিলেন অপেক্ষাকৃত খর্বকায়। এই অস্বাভাবিক শারীরিক গঠনের কারণে এবং সে যুগের প্রচলিত সামরিক মানদণ্ডে সুদর্শন না হওয়ায়, তিনি প্রাথমিক জীবনে চাকরি পেতে চরম ব্যর্থতার সম্মুখীন হন। গজনীর সুলতান মুহাম্মদ ঘোরীর সৈন্যবাহিনীতে যোগদানের উদ্দেশ্যে তিনি গজনীতে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত হন। এরপর তিনি ভারতের দিল্লিতে কুতুবউদ্দীন আইবেকের দরবারেও সামরিক পদে নিয়োগ পেতে ব্যর্থ হন। তবে এই ব্যর্থতা তাঁকে নিরাশ করেনি, বরং তিনি তাঁর ভাগ্যান্বেষণে আরও পূর্ব দিকে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
কর্মজীবনের সূচনা ও বিহার বিজয়
দিল্লি থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে বখতিয়ার খলজী বদায়ুনে যান এবং সেখানকার শাসনকর্তা মালিক হিজবরুদ্দীন হাসানের অধীনে একটি সামান্য সামরিক পদে নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে তিনি অযোধ্যার শাসনকর্তা মালিক হুসামুদ্দীনের অধীনে চাকরি গ্রহণ করেন। হুসামুদ্দীন বখতিয়ারের সাহস ও সামরিক দক্ষতার পরিচয় পেয়ে তাঁকে মির্জাপুর জেলার ভগবত ও ভিউলি নামক দুটি পরগনার জায়গির প্রদান করেন [Sarkar, History of Bengal, Vol-II, 1948]। এই জায়গির দুটিই ছিল তাঁর ভবিষ্যৎ সাফল্যের মূল ভিত্তি। এখান থেকেই তিনি তাঁর নিজস্ব একটি ক্ষুদ্র সামরিক বাহিনী গঠন করতে শুরু করেন, যার মধ্যে প্রধানত তাঁর নিজের খলজী গোত্রের আফগান ও তুর্কি ভাগ্যান্বেষী যুবকরা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে (আনুমানিক ১১৯৯-১২০০ খ্রিস্টাব্দে), বখতিয়ার খলজী তাঁর ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে পার্শ্ববর্তী বিহার অঞ্চলে আক্রমণ শুরু করেন। তৎকালীন বিহার অঞ্চলটি ছিল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হিন্দু রাজাদের শাসনাধীন এবং রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। বখতিয়ার অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে বিহারের প্রাচীরবেষ্টিত ওদান্তপুরী মহাবিহার আক্রমণ করেন এবং তা জয় করেন। এই অভিযানে বহু বৌদ্ধ ভিক্ষু নিহত হন এবং বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদ তাঁর হস্তগত হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, এই আক্রমণেই নালন্দা ও বিক্রমশীলার মতো প্রাচীন বৌদ্ধ মহাবিহারগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, যা ছিল ভারতের প্রাচীন শিক্ষা ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি [Majumdar, The History and Culture of the Indian People, 1943]। বিহার বিজয়ের পর বখতিয়ার প্রচুর উপঢৌকন নিয়ে কুতুবউদ্দীন আইবেকের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং আইবেক তাঁকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে পুরস্কৃত করে বিহারের শাসনকর্তা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন।
বাংলা বিজয়: নদীয়া আক্রমণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বিহার বিজয়ের পর বখতিয়ার খলজীর দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় ধনধান্যে পুষ্পে ভরা বাংলার দিকে। তৎকালীন বাংলার শাসক ছিলেন সেন বংশের প্রবীণ রাজা লক্ষ্মণ সেন। লক্ষ্মণ সেন সে সময় বাংলার অন্যতম রাজধানী এবং তীর্থস্থান নদীয়ায় (বর্তমান নবদ্বীপ) অবস্থান করছিলেন। নদীয়া হিন্দু ধর্মের একটি প্রধান কেন্দ্র হওয়ায় রাজা জীবনের শেষ দিনগুলো সেখানে অতিবাহিত করতে চেয়েছিলেন। ১২০৩ বা ১২০৪ খ্রিস্টাব্দের দিকে (ঐতিহাসিকদের মধ্যে সাল নিয়ে সামান্য মতভেদ রয়েছে) বখতিয়ার খলজী বাংলা আক্রমণের জন্য অগ্রসর হন।
বখতিয়ার খলজীর নদীয়া বিজয়ের ঘটনাটি ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর এবং আলোচিত একটি অধ্যায়। মিনহাজ-উস-সিরাজের বর্ণনা অনুযায়ী, বখতিয়ার খলজী তাঁর মূল সেনাবাহিনী নিয়ে বিহার থেকে যাত্রা শুরু করেন, কিন্তু তিনি প্রচলিত রাজপথ পরিহার করে ঝাড়খণ্ডের গভীর ও দুর্গম জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এত দ্রুত অগ্রসর হন যে, তাঁর মূল সেনাবাহিনী তাঁর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারেনি [Minhaj-i-Siraj, Tabaqat-i-Nasiri]। ফলস্বরূপ, নদীয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর সময় তাঁর সাথে মাত্র ১৮ জন অশ্বারোহী সৈন্য ছিল।
বখতিয়ার ও তাঁর এই ক্ষুদ্র দল ঘোড়া ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে নদীয়ার নগরদ্বার অতিক্রম করে সরাসরি রাজা লক্ষ্মণ সেনের প্রাসাদের সামনে উপস্থিত হন। অতর্কিত এই আক্রমণে প্রাসাদের রক্ষীরা হতভম্ব হয়ে পড়ে এবং কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। রাজা লক্ষ্মণ সেন সে সময় মধ্যাহ্নভোজনে বসেছিলেন। আকস্মিক আক্রমণের খবর পেয়ে এবং আক্রমণকারীদের ক্ষিপ্রতা দেখে রাজা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। তিনি প্রাসাদের পেছনের দরজা দিয়ে নৌকায় করে স্বপরিবারে পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুরে (বর্তমান মুন্সিগঞ্জ) পালিয়ে যান। এভাবে বিনা রক্তপাতে এবং মাত্র ১৮ জন সৈন্য নিয়ে (মূল বাহিনী কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পৌঁছায়) বখতিয়ার খলজী নদীয়া অধিকার করেন। এই ‘১৮ জন অশ্বারোহী’র ঘটনাটি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক থাকলেও, এটি মূলত বখতিয়ারের গেরিলা কৌশল এবং সেন বাহিনীর চরম অপ্রস্তুতির একটি প্রমাণ [Eaton, The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1993]।
গৌড় অধিকার ও শাসনতান্ত্রিক বিন্যাস
নদীয়া অধিকারের পর বখতিয়ার খলজী সেখানে দীর্ঘকাল অবস্থান করেননি। কারণ নদীয়া ছিল প্রশাসনিক ও সামরিক দিক থেকে অরক্ষিত এবং ভৌগোলিকভাবে বাংলার এক প্রান্তে অবস্থিত। তিনি নদীয়ার পরিবর্তে বাংলার প্রাচীন রাজধানী গৌড় বা লক্ষ্মণাবতীর দিকে অগ্রসর হন এবং তা অধিকার করে নিজের রাজধানী স্থাপন করেন। গৌড় অধিকারের মাধ্যমে তিনি উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম বাংলার উপর তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন [Sarkar, History of Bengal, Vol-II, 1948]।
বখতিয়ার খলজী কেবল একজন নিপুণ সামরিক সেনাপতিই ছিলেন না, একজন দক্ষ প্রশাসকও ছিলেন। তিনি তাঁর বিজিত অঞ্চলকে কয়েকটি প্রশাসনিক ইউনিটে (যাকে ‘ইকতা’ বলা হতো) বিভক্ত করেন এবং তাঁর বিশ্বস্ত অনুচরদের, যেমন আলী মর্দন খলজী, হুসামউদ্দীন ইওয়াজ খলজী এবং মুহাম্মদ শিরান খলজীকে এসব অঞ্চলের শাসনকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেন। তাঁর শাসনামলে বাংলায় প্রথম মুসলিম শাসনকাঠামো গড়ে ওঠে। তিনি সুলতান মুহম্মদ ঘোরীর নামে খুতবা পাঠ করেন এবং নিজের নামে কোনো স্বাধীন মুদ্রা প্রচলন না করে দিল্লির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন। বখতিয়ার তাঁর নতুন রাজ্যে বহু মসজিদ, মাদ্রাসা এবং সুফি সাধকদের জন্য খানকাহ নির্মাণ করেন। এর ফলে মধ্য এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে বহু ইসলামি পণ্ডিত, ওলেমা এবং সুফি দরবেশ বাংলায় আগমন করতে শুরু করেন, যা বাংলার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসে।
উচ্চাভিলাষী তিব্বত অভিযান
বাংলা ও বিহারের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর বখতিয়ার খলজীর উচ্চাভিলাষ আরও বৃদ্ধি পায়। তিনি তিব্বত ও চীন আক্রমণ করে সেখানকার ঘোড়া ও অন্যান্য সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন। সে সময় তিব্বতের সাথে বাংলার একটি প্রাচীন বাণিজ্য পথ চালু ছিল। ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে প্রায় ১০,০০০ অশ্বারোহী সেনার এক বিশাল বাহিনী নিয়ে বখতিয়ার খলজী তাঁর দুঃসাহসিক তিব্বত অভিযানে বের হন [Minhaj-i-Siraj, Tabaqat-i-Nasiri]।
এই অভিযানে তাঁকে পথ দেখানোর দায়িত্ব পালন করেন ‘আলী মেচ’ নামক স্থানীয় এক উপজাতীয় নেতা, যিনি বখতিয়ারের হাতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। বখতিয়ারের বাহিনী কামরূপ (বর্তমান আসাম) রাজ্যের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়। কামরূপের রাজা বখতিয়ারকে সে বছর অভিযান স্থগিত রেখে পরের বছর উপযুক্ত সময়ে অভিযান চালানোর পরামর্শ দেন এবং তাঁকে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু অতি আত্মবিশ্বাসী বখতিয়ার এই পরামর্শ উপেক্ষা করে হিমালয়ের দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হন।
তিব্বত সীমান্ত অতিক্রম করার পর একটি সুদৃঢ় দুর্গ আক্রমণ করতে গিয়ে তাঁর বাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। স্থানীয় তিব্বতীয়রা প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং ‘পোড়ামাটি নীতি’ অবলম্বন করে সমস্ত খাদ্যশস্য ও রসদ ধ্বংস করে দেয়। রসদের অভাব, অচেনা পার্বত্য পথ এবং প্রচণ্ড শীতের কারণে বখতিয়ারের বাহিনী চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে বখতিয়ার পশ্চাদপসরণের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ফিরে আসার পথে কামরূপের রাজা চুক্তি ভঙ্গ করে বখতিয়ারের ক্লান্ত বাহিনীর উপর আক্রমণ চালান এবং নদী পারাপারের একমাত্র পাথরের সেতুটি ধ্বংস করে দেন। বখতিয়ারের বিশাল বাহিনীর অধিকাংশ সেনাই এই বিপর্যয়ে মারা যান বা নদীতে ডুবে যান। বখতিয়ার মাত্র শ খানেক সৈন্য নিয়ে অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় দেবকোটে (বর্তমান ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা) ফিরে আসতে সক্ষম হন [Majumdar, The History and Culture of the Indian People, 1943]।
মৃত্যু ও রাজনৈতিক পরিণতি
তিব্বত অভিযানের এই চরম ব্যর্থতা বখতিয়ার খলজীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। তিনি গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হন এবং গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি দিনের পর দিন প্রাসাদে আবদ্ধ থাকতেন এবং লোকলজ্জায় বাইরে বের হতেন না। এমতাবস্থায়, ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁরই এক বিশ্বস্ত অনুচর এবং ঘোড়াঘাটের শাসনকর্তা আলী মর্দন খলজী তাঁকে দেবকোটে নির্মমভাবে হত্যা করেন [Sarkar, History of Bengal, Vol-II, 1948]। তাঁর মৃত্যুর পর খলজী আমিরদের মধ্যে ক্ষমতার চরম দ্বন্দ্ব শুরু হয়, যা পরবর্তী কয়েক বছর বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল।
ঐতিহাসিক প্রভাব ও উপসংহার
ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজীর শাসনকাল ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত (আনুমানিক ১২০৩-১২০৬ খ্রিস্টাব্দ), কিন্তু বাংলার সুদীর্ঘ ইতিহাসে তাঁর রেখে যাওয়া প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী এবং অপরিসীম। তিনি এমন এক সময়ে বাংলায় পদার্পণ করেছিলেন যখন সেন রাজবংশ অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং দুর্বল নেতৃত্বের কারণে মুমূর্ষু অবস্থায় ছিল। বখতিয়ার খলজীর বাংলা বিজয় এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী হিন্দু ও বৌদ্ধ রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসান ঘটায়।
তাঁর প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থা বাংলায় একটি নতুন যুগে প্রবেশাধিকার দিয়েছিল। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির যে বীজ বাংলায় রোপিত হয়েছিল, তা পরবর্তী স্বাধীন সুলতানি আমলে মহীরুহে পরিণত হয়। বখতিয়ারের বিজয়ের ফলেই বহির্বিশ্বের সাথে বাংলার যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার সাথে। যদিও তিনি মন্দির ও মঠ ধ্বংসের মতো ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে যুক্ত ছিলেন, তথাপি বাংলার রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং একটি সম্পূর্ণ নতুন সমাজব্যবস্থার গোড়াপত্তন করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। ইতিহাসবিদদের চোখে বখতিয়ার খলজী একজন নির্মম বিজেতা এবং একই সাথে একজন দূরদর্শী সাম্রাজ্য নির্মাতা হিসেবে চিরকাল বাংলার ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর সাহস, ক্ষিপ্রতা এবং সামরিক প্রজ্ঞাই তাঁকে ইতিহাসের একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে, যাঁর নাম উচ্চারণ ছাড়া বাংলার মধ্যযুগের ইতিহাসের সূচনা কল্পনা করাও অসম্ভব।