মেজর জেনারেল রবার্ট ক্লাইভ

মেজর জেনারেল রবার্ট ক্লাইভ (১৭২৫–১৭৭৪), যিনি ইতিহাসে ‘ক্লাইভ অব ইন্ডিয়া’ নামেও ব্যাপকভাবে পরিচিত, ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন অন্যতম প্রধান সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তা। ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপনের মূল রূপকার হিসেবে তাঁকে গণ্য করা হয়। তিনি মাত্র ১৮ বছর বয়সে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন সাধারণ কেরানি (রাইটার) হিসেবে মাদ্রাজে (বর্তমান চেন্নাই) এসেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে নিজের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, ধূর্ততা, সামরিক কৌশল ও রাজনৈতিক চালের মাধ্যমে তিনি একজন পরাক্রমশালী সেনাপতি এবং বাংলার প্রথম ব্রিটিশ গভর্নর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

পলাশীর যুদ্ধ ও ব্রিটিশ আধিপত্যের সূচনা

দক্ষিণ ভারতে আর্কটের যুদ্ধে (১৭৫১) ফরাসি ও তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে অভাবনীয় সাফল্যের মাধ্যমে ক্লাইভ প্রথমবারের মতো তার সামরিক প্রতিভার জানান দেন। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে নির্ণায়ক ও ঐতিহাসিক ঘটনাটি ঘটে ১৭৫৭ সালে সুবে বাংলায়। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে বিরোধের জেরে তিনি সেনাপতি মীরজাফর, জগৎ শেঠ, উমিচাঁদ প্রমুখের সাথে একটি গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ঐতিহাসিক পলাশীর প্রান্তরে এই ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার সুযোগ নিয়ে রবার্ট ক্লাইভ নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করেন। এই বিজয়ের মাধ্যমেই কার্যত ভারতবর্ষে দীর্ঘ দুই শতাব্দীর ব্রিটিশ রাজনৈতিক ও সামরিক আধিপত্যের সূচনা ঘটে।

দেওয়ানি লাভ ও দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা

পলাশীর যুদ্ধের পর মীরজাফরকে পুতুল নবাব হিসেবে সিংহাসনে বসিয়ে ক্লাইভ ও তাঁর সহযোগীরা বাংলা থেকে বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদ লুণ্ঠন করেন। ১৭৬৫ সালে দ্বিতীয়বার বাংলার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে এলাহাবাদ চুক্তির মাধ্যমে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার ‘দেওয়ানি’ (রাজস্ব আদায়ের অধিকার) লাভ করেন। এরপর তিনি বাংলায় কুখ্যাত ‘দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা’ (Dual Government) প্রবর্তন করেন। এই ব্যবস্থায় রাজস্ব আদায় ও প্রতিরক্ষার প্রকৃত ক্ষমতা কোম্পানির হাতে থাকলেও, আইন-শৃঙ্খলা ও বিচারবিভাগীয় দায়িত্ব নবাবের হাতে রাখা হয়। ক্ষমতাহীন দায়িত্ব এবং দায়িত্বহীন ক্ষমতার এই চরম শোষক কাঠামোর ফলে বাংলায় ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও প্রশাসনিক অরাজকতা সৃষ্টি হয়, যার প্রত্যক্ষ পরিণতি ছিল ১৭৭০ সালের (বাংলা ১১৭৬) ভয়াবহ ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’।

সমালোচনা, বিচার ও মৃত্যু

ভারতবর্ষ থেকে বিপুল ধনসম্পদ অর্জন করে ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার পর রবার্ট ক্লাইভ নিজ দেশেই চরম বিতর্কের মুখে পড়েন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারকার্য পরিচালিত হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ পার্লামেন্ট তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তারের অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে তাঁকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়, কিন্তু তীব্র সামাজিক সমালোচনা, মানসিক অবসাদ এবং শারীরিক অসুস্থতার (পিত্তথলির ব্যথা ও আফিমের প্রতি আসক্তি) কারণে ১৭৭৪ সালের ২২ নভেম্বর মাত্র ৪৯ বছর বয়সে তিনি নিজ বাসভবনে আত্মহত্যা করেন। ব্রিটিশ ইতিহাসে তিনি সাম্রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থপতি হিসেবে প্রশংসিত হলেও, ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে তিনি একজন ধূর্ত ষড়যন্ত্রকারী, লুটেরা ও নির্মম শোষক হিসেবেই চিরকাল চিহ্নিত হয়ে আছেন।