শূলপাণি

শূলপাণি ছিলেন একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীর প্রাচীন বাংলার সেন রাজবংশের সমসাময়িক একজন অত্যন্ত প্রতিভাবান ও প্রখ্যাত ভাস্কর (প্রস্তরশিল্পী)। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে শিল্পীদের নাম সাধারণত আড়ালেই থেকে যেত, তবে শূলপাণি সেই বিরল শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম, যাঁর নাম, বংশপরিচয় এবং অসাধারণ শিল্পনৈপুণ্যের কথা একটি রাজকীয় শিলালিপিতে অত্যন্ত সম্মানের সাথে খোদিত রয়েছে। রাজা বিজয় সেনের রাজত্বকালে বিখ্যাত ‘দেওপাড়া প্রশস্তি’ প্রস্তরখণ্ডে খোদাই করার অসামান্য কৃতিত্ব তাঁরই।

বংশপরিচয় ও উপাধি

‘দেওপাড়া প্রশস্তি’-এর একেবারে শেষ শ্লোকে (৩৬ নম্বর শ্লোক) রচয়িতা কবি উমাপতি ধর অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে এই প্রশস্তির খোদাইকার হিসেবে শূলপাণির নাম উল্লেখ করেছেন। শিলালিপি থেকে জানা যায়, তিনি ছিলেন একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্পী পরিবারের সন্তান। তাঁর পিতার নাম বৃহস্পতি, পিতামহ (দাদা) মানদাস এবং প্রপিতামহ (পরদাদা) ছিলেন ধর্ম। এই প্রশস্তিতে তাঁর অসামান্য শিল্পনৈপুণ্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ‘বরেন্দ্রক শিল্পীগোষ্ঠীর চূড়ামণি’ (অর্থাৎ বরেন্দ্র বা উত্তর বাংলার শিল্পীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বা মুকুটমণি) উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে।

শিল্পনৈপুণ্য ও অবদান

শূলপাণির শ্রেষ্ঠ এবং একমাত্র আবিষ্কৃত কীর্তি হলো রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে প্রাপ্ত ‘দেওপাড়া প্রশস্তি’। উমাপতি ধরের রচিত সুলিখিত সংস্কৃত শ্লোকগুলোকে একটি অত্যন্ত শক্ত কালো পাথরের গায়ে তিনি এমন নিখুঁত, ছন্দোবদ্ধ এবং সুষমভাবে খোদাই করেছিলেন যে, শত শত বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও অক্ষরগুলোর সৌন্দর্য ও স্পষ্টতা অম্লান রয়েছে। পাথর খোদাই করে এমন নিখুঁত লিপিচিত্র তৈরি করা তৎকালীন ভাস্কর্যশিল্পের এক চরম উৎকর্ষের প্রমাণ বহন করে।

মূল্যায়ন

প্রাচীন বাংলার শিল্পকলার ইতিহাসে শূলপাণির নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। রাজা বিজয় সেনের মতো পরাক্রমশালী সম্রাটের রাজকীয় শিলালিপিতে কবির নামের পাশাপাশি একজন ভাস্করের নাম ও বংশপরিচয় এমন সগৌরবে স্থান পাওয়াটা সে যুগে অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা ছিল। এটি প্রমাণ করে যে, সেন যুগে কেবল সাহিত্য বা শাস্ত্রচর্চাই নয়, বরং ভাস্কর্য ও চারুকলার মতো সৃজনশীল পেশার শিল্পীরাও সমাজে এবং রাজদরবারে অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন।