বিশ্বরূপ সেন

বিশ্বরূপ সেন ছিলেন প্রাচীন বাংলার সেন রাজবংশের শেষ পর্বের একজন গুরুত্বপূর্ণ শাসক। তিনি ছিলেন সেন সাম্রাজ্যের পরাক্রমশালী কিন্তু পতনোন্মুখ যুগের রাজা লক্ষ্মণ সেনের সুযোগ্য পুত্র। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজির অতর্কিত আক্রমণে রাজধানী নদিয়া (নবদ্বীপ) ও উত্তর বাংলা সেনদের হাতছাড়া হয়ে যায়। এরপর লক্ষ্মণ সেন পূর্ব বাংলার বিক্রমপুরে (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ) আশ্রয় নেন। আনুমানিক ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে লক্ষ্মণ সেনের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র বিশ্বরূপ সেন বিক্রমপুরের সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় সেন বংশের শাসন অব্যাহত রাখেন।

শাসনকাল ও সামরিক প্রতিরোধ

বিশ্বরূপ সেনের শাসনকাল বাংলার ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সেন সাম্রাজ্যের বড় একটি অংশ মুসলিম শাসকদের দখলে চলে গেলেও তিনি পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।

  • মুসলিম আগ্রাসন প্রতিরোধ: তিনি কেবল একজন নামেমাত্র শাসক ছিলেন না। ঐতিহাসিক তথ্যমতে, তিনি মুসলিম বাহিনীর পরবর্তী আগ্রাসনগুলো বেশ সফলভাবেই প্রতিরোধ করেছিলেন। তাঁর এই সামরিক দৃঢ়তার কারণেই পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় স্বাধীন সেন শাসন আরও বেশ কয়েক দশক টিকে ছিল।

  • রাজকীয় উপাধি: সাম্রাজ্য সংকুচিত হলেও তিনি নিজের রাজকীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতে দেননি। তাঁর তাম্রশাসনে তাঁকে ‘অরিরাজ-বৃষভাঙ্ক-শঙ্কর’ এবং ‘গৌড়েশ্বর’-এর মতো উচ্চাঙ্গের রাজকীয় উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে।

ঐতিহাসিক উৎস ও তাম্রশাসন

বিশ্বরূপ সেনের রাজত্বকাল সম্পর্কে জানার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস হলো তাঁর নিজস্ব অনুশাসনগুলো। তাঁর রাজত্বকালে উৎকীর্ণ ‘মদনপাড়া তাম্রশাসন’ এবং ‘সাহিত্য পরিষৎ তাম্রশাসন’ থেকে তাঁর রাজ্যসীমা, সামরিক কৃতিত্ব, ভূমিদান এবং তৎকালীন শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত ও প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায়।

ধর্মীয় বিশ্বাস ও আনুকূল্য

সেন বংশের পূর্ববর্তী রাজারা প্রধানত শৈব (বিজয় সেন, বল্লাল সেন) বা বৈষ্ণব (লক্ষ্মণ সেন) ধর্মের প্রবল অনুরাগী ছিলেন। কিন্তু বিশ্বরূপ সেন মূলত সৌর বা সূর্যদেবের উপাসক ছিলেন বলে তাঁর তাম্রশাসনগুলো থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে পূর্বসূরিদের মতোই তিনি সনাতন হিন্দু ধর্মের অন্যান্য দেব-দেবীর প্রতিও সমান শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং তাঁর শাসনকালেও ব্রাহ্মণদের ভূমি দান ও হিন্দু সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত ছিল।

উপসংহার

ঐতিহাসিকদের মতে, বিশ্বরূপ সেন প্রায় ১৪ বছর (আনুমানিক ১২০৬–১২২০ খ্রি.) পূর্ব বাংলায় রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ভাই কেশব সেন সিংহাসনে বসেন। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে সেন সাম্রাজ্য যখন প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, তখন বিশ্বরূপ সেনের সামরিক প্রতিরোধ ও প্রশাসনিক দৃঢ়তাই পূর্ব বাংলায় হিন্দু শাসনকে আরও কিছুকাল টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।