দ্বিতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ

দ্বিতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ (১৮৭৮–১৮৮০) ছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর এশীয় ভূ-রাজনীতির ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি সামরিক সংঘাত। এই যুদ্ধটি মূলত ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এবং আফগানিস্তানের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল, তবে এর অন্তরালে ছিল দীর্ঘদিনের ‘দ্য গ্রেট গেম’ (The Great Game) বা মধ্য এশিয়ায় ব্রিটিশ ও রুশ সাম্রাজ্যের আধিপত্য বিস্তারের এক নীরব ও উত্তপ্ত লড়াই। ১৮৭৬ সালে লর্ড লিটন যখন ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তিনি উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে ব্রিটিশ প্রভাব বিস্তারের জন্য একটি কঠোর এবং আপসহীন ‘ফরোয়ার্ড পলিসি’ (Forward Policy) গ্রহণ করেন। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল আফগানিস্তানকে রাশিয়ার প্রভাব বলয় থেকে মুক্ত রেখে ব্রিটিশ স্বার্থের উপযোগী একটি ‘বাফার স্টেট’ বা মধ্যবর্তী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা। সেই সময় আফগানিস্তানের আমির শের আলী খান রাশিয়ার সাথে সখ্যতা বৃদ্ধি করছিলেন, যা ব্রিটিশ নীতিনির্ধারকদের মধ্যে প্রচণ্ড ভীতি ও উদ্বেগের জন্ম দেয়। ব্রিটিশরা যখন কাবুল বা আফগানিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ শহরে ব্রিটিশ মিশন বা স্থায়ী প্রতিনিধি রাখার দাবি জানায়, আমির শের আলী তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। এর ফলে ১৮৭৮ সালের নভেম্বরে ব্রিটিশ বাহিনী বিশাল সামরিক শক্তি নিয়ে আফগানিস্তান আক্রমণ করে, যা ইতিহাসের পাতায় দ্বিতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ নামে পরিচিত।

যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে ব্রিটিশ বাহিনীর সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের কাছে আফগান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেকটা ভেঙে পড়ে। ব্রিটিশ বাহিনী তিনটি আলাদা রুট দিয়ে আফগানিস্তানে প্রবেশ করে এবং খুব দ্রুত কন্দাহার ও জালালাবাদ দখল করে নেয়। আমিরের বাহিনী ব্রিটিশদের আধুনিক তোপখানা এবং প্রযুক্তির সামনে টিকতে না পেরে পিছু হটতে বাধ্য হয়। ১৮৭৯ সালের মে মাসে আমির শের আলী খানের মৃত্যু হলে তাঁর ছেলে আমির মোহাম্মদ ইয়াকুব খান ক্ষমতায় আরোহণ করেন এবং ব্রিটিশদের সাথে ‘গন্দমক চুক্তি’ (Treaty of Gandamak) স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। এই চুক্তির শর্তানুসারে, আফগানিস্তানের বৈদেশিক সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণ ব্রিটিশদের হাতে অর্পিত হয় এবং সীমান্তে ব্রিটিশদের সুবিধামতো এলাকা পরিদর্শনের ক্ষমতা দেওয়া হয়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছিল ব্রিটিশরা তাদের উদ্দেশ্য সফল করেছে এবং আফগানিস্তান এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু এই শান্তি ছিল কেবল ঝড়ের পূর্বাভাস। গন্দমক চুক্তির মাত্র কয়েক মাস পরেই ১৮৭৯ সালের সেপ্টেম্বরে কাবুলে অবস্থানরত ব্রিটিশ প্রতিনিধি স্যার লুই ক্যাভাগনানি এবং তাঁর পুরো কূটনৈতিক দল আফগান বিদ্রোহীদের হাতে নৃশংসভাবে নিহত হয়। এই ঘটনা ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনিক মহলে এক গভীর সংকটের সৃষ্টি করে এবং ব্রিটিশ সরকারকে বাধ্য করে পুনরায় আফগানিস্তান নিয়ন্ত্রণে নিতে।

পুনরায় যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায়ে ব্রিটিশ বাহিনী কাবুল দখল করে এবং আমির ইয়াকুব খানকে ক্ষমতাচ্যুত করে দেশত্যাগ করতে বাধ্য করে। তবে এই পর্যায়ে আফগানদের প্রতিরোধের ধরন বদলে যায়। তারা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগঠিত গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে এবং কাবুলের বাইরেও ব্রিটিশদের অবস্থান কঠিন করে তোলে। ১৮৮০ সালের জুলাই মাসে মেইওয়ান্ডের যুদ্ধ (Battle of Maiwand) এই সংঘাতের অন্যতম রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। এই যুদ্ধে আফগান বাহিনীর অসীম সাহসিকতা ও গেরিলা রণকৌশলের কাছে ব্রিটিশ বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। মেইওয়ান্ডের এই পরাজয় ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে দেয় এবং লর্ড লিটনের নীতি নিয়ে লন্ডনের পার্লামেন্টে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। শেষ পর্যন্ত লর্ড রবার্টসের নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনী দীর্ঘ লড়াইয়ের পর কন্দাহারে জয়লাভ করতে সক্ষম হলেও, তারা বুঝতে পেরেছিল যে আফগানিস্তানের মতো দুর্গম ও রক্ষণশীল দেশে দীর্ঘস্থায়ী শাসন বজায় রাখা সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে অসম্ভব। এরপর ব্রিটিশ সরকার একটি সমঝোতামূলক পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেয়।

যুদ্ধের সমাপ্তি পর্বে ব্রিটিশরা আমির আবদুর রহমান খানকে আফগানিস্তানের নতুন শাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। আবদুর রহমান খান অত্যন্ত কৌশলী ও দূরদর্শী ছিলেন। তিনি ব্রিটিশদের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেন যে, তিনি বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্রিটিশদের পরামর্শ মেনে চলবেন এবং বিনিময়ে ব্রিটিশরা আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে তাকে বার্ষিক অনুদান দেবে। এই চুক্তির ফলে ব্রিটিশরা তাদের ‘বাফার স্টেট’ তৈরির মূল লক্ষ্য অর্জনে সফল হয় এবং আফগানিস্তানে সরাসরি সামরিক দখলদারিত্ব থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়। এই যুদ্ধটি কেবল সামরিক সংঘাত ছিল না, বরং এটি ছিল আফগানিস্তানের জাতীয় আত্মপরিচয় ও সার্বভৌমত্বের এক অগ্নিপরীক্ষা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য এই যুদ্ধটি ছিল এক চরম শিক্ষা—অফুরন্ত অর্থ ও প্রাণ ঝরিয়েও একটি স্বাধীনচেতা জাতিকে কেবল সামরিক শক্তির জোরে আয়ত্তে রাখা যায় না। মেইওয়ান্ডের যুদ্ধে ব্রিটিশদের পরাজয় আজও আফগানদের বীরত্বের প্রতীক হিসেবে উচ্চারিত হয়, আর ব্রিটিশদের জন্য এটি হয়ে আছে তাদের ঔপনিবেশিক উচ্চাভিলাষের এক ব্যর্থ অধ্যায়।

এই যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রভাব ছিল অত্যন্ত ব্যাপক। আফগানিস্তানের মানচিত্র এবং রাজনৈতিক কাঠামো চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয় এই সংঘাতের মধ্য দিয়ে। যদিও ব্রিটিশরা তাদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়েছিল, তবে তারা আফগান জনগণের মনে এক গভীর ক্ষোভ ও বিদ্বেষের বীজ বপন করে দিয়েছিল, যা পরবর্তীকালে আফগানিস্তানের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে। যুদ্ধ পরবর্তী আবদুর রহমান খানের শাসনামল আফগানিস্তানের আধুনিকীকরণের ভিত্তি স্থাপন করলেও, বৈদেশিক শক্তির সাথে দেশের ভাগ্যের এই খেলা আফগানদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সদা সতর্ক থাকার শিক্ষা দিয়েছিল। দ্বিতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ প্রমাণ করে যে, এশিয়ায় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর দাবার বোর্ডে আফগানিস্তান সবসময়ই এক গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল ঘুঁটি হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। আজও ঐতিহাসিকগণ এই যুদ্ধটিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের চরম সীমাবদ্ধতা এবং আফগানদের অদম্য প্রতিরোধের একটি উজ্জ্বল দলিল হিসেবে মূল্যায়ন করেন। লর্ড লিটনের সেই উচ্চাভিলাষী ‘ফরোয়ার্ড পলিসি’ শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয় বয়ে এনেছিল, যার রেশ স্বাধীনতার কয়েক দশক পরও প্রশমিত হয়নি। পরিশেষে বলা যায়, এই যুদ্ধটি ছিল ১৯ শতকের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের এমন এক বাঁক, যা কেবল আফগানিস্তানের ভাগ্যই পরিবর্তন করেনি, বরং ব্রিটিশদের প্রাচ্য বিষয়ক কূটনীতিতেও এক বড় ধরনের সংশোধন আনতে বাধ্য করেছিল। এই সংঘাতটি আজও মনে করিয়ে দেয় যে, ভৌগোলিক অবস্থানের চেয়ে জনগণের স্বকীয়তা ও স্বাধীনতা রক্ষা করার ইচ্ছাশক্তি যেকোনো সাম্রাজ্যের উচ্চাভিলাষের চেয়ে শক্তিশালী।