রোকেয়া মান্নান

অধ্যক্ষ রোকেয়া মান্নান বাংলাদেশের নারী শিক্ষার প্রসারে একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং শিক্ষানুরাগী হিসেবে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় একটি নাম। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ঢাকার আজিমপুরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘অগ্রণী স্কুল ও কলেজ’-এর অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং প্রতিষ্ঠানটির মানোন্নয়নে আমূল পরিবর্তন এনেছেন। ড. কাজী আনোয়ারা মনসুরের প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে একটি আধুনিক ও সময়োপযোগী শিক্ষাকেন্দ্রে রূপান্তর করার পেছনে অধ্যক্ষ রোকেয়া মান্নানের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে তিনি কেবল পাঠ্যপুস্তকের শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেননি, বরং ছাত্রীদের চরিত্র গঠন, মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং আত্মবিশ্বাসী নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আপসহীন। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা এবং দিকনির্দেশনায় অগ্রণী স্কুল ও কলেজ ধারাবাহিক সাফল্যের শীর্ষে আরোহণ করেছে, যা এস.এস.সি এবং এইচ.এস.সি পরীক্ষার ফলাফলগুলোতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।

শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘদিনের একনিষ্ঠ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘বেগম রোকেয়া পদকে’ ভূষিত করে। এটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন ছিল না, বরং এটি ছিল নারী শিক্ষার প্রসারে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টার এক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। একজন অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি ছিলেন ছাত্রীদের কাছে একজন অভিভাবক এবং শিক্ষকদের কাছে একজন আদর্শ সহকর্মী। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি শিক্ষিত জাতি গঠনে নারীদের সমঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ছাড়া উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। তাঁর কঠোর শৃঙ্খলাপরায়ণ মনোভাব এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি অকৃত্রিম স্নেহ আজও বিদ্যালয়ের প্রাক্তন এবং বর্তমান শিক্ষার্থীদের মনে গেঁথে আছে। তিনি যখন দায়িত্ব পালন করেছেন, তখন অগ্রণী স্কুল ও কলেজ নারী শিক্ষার এক অনন্য প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। তাঁর সময়েই প্রতিষ্ঠানটিতে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখার পরিধি বৃদ্ধি পায় এবং শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণে তিনি বিভিন্ন আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি প্রবর্তন করেন।

অধ্যক্ষ রোকেয়া মান্নানের কর্মজীবন আমাদের শেখায় যে, শিক্ষার প্রসার কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি মহান ব্রত। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত সহজ-সরল ও বিনয়ী ছিলেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ়। আজিমপুর এলাকায় নারী শিক্ষার যে বিপ্লব আমরা লক্ষ্য করি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন ড. কাজী আনোয়ারা মনসুর এবং সেই ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী ও সুসংহত করেছিলেন অধ্যক্ষ রোকেয়া মান্নান। তাঁর প্রস্থান বা অবসর গ্রহণ কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মানকে ধসিয়ে দিতে পারে না যদি তার নেতৃত্বে সঠিক দর্শন থাকে, এই প্রবাদটি তিনি তাঁর কর্মজীবনের মাধ্যমে প্রমাণ করে গেছেন। বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ সম্মাননা প্রাপ্তি তাঁর কর্মের যোগ্য মূল্যায়নের প্রতিফলন ঘটলেও, তিনি প্রকৃতপক্ষে অমর হয়ে আছেন সেই হাজার হাজার শিক্ষার্থীর হৃদয়ে, যাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন তিনি। আজকের আধুনিক বাংলাদেশে অগ্রণী স্কুল ও কলেজ যে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত, তার পেছনে তাঁর মতো দূরদর্শী ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষাবিদের অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তাঁর জীবন ও আদর্শ আজও বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষকদের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে চলেছে এবং ভবিষ্যতে যারা নারী শিক্ষা নিয়ে কাজ করতে ইচ্ছুক, তাদের জন্য তিনি চিরকাল পথের দিশা হয়ে থাকবেন।