উমাপতি ধর প্রাচীন বাংলার সেন রাজবংশের সমসাময়িক একজন প্রখ্যাত সংস্কৃত কবি, বিদগ্ধ পণ্ডিত এবং রাজকর্মকর্তা ছিলেন। একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে প্রাচীন বাংলার সংস্কৃত সাহিত্যচর্চা যখন চরম উৎকর্ষ লাভ করেছিল, তখন তিনি ছিলেন সেই বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের অন্যতম প্রধান সারথি। তিনি মূলত রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজসভার বিখ্যাত ‘পঞ্চরত্ন’-এর অন্যতম সদস্য হিসেবে এবং সেন সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক শিলালিপি ‘দেওপাড়া প্রশস্তি’-এর রচয়িতা হিসেবে বাংলার ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও কর্মজীবন
ঐতিহাসিকদের মতে, উমাপতি ধর অত্যন্ত দীর্ঘজীবী ছিলেন এবং সেন রাজবংশের একাধিক পরাক্রমশালী শাসকের রাজত্বকাল তিনি স্বচক্ষে দেখেছিলেন। তিনি সেন সাম্রাজ্যের প্রকৃত রূপকার রাজা বিজয় সেনের অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন এবং সম্ভবত তাঁর রাজসভায় মন্ত্রী বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজসভাতেও অত্যন্ত সম্মানিত পণ্ডিত হিসেবে সমাদৃত হন। জয়দেব, ধোয়ী, গোবর্ধন আচার্য এবং শরণের মতো তৎকালীন শ্রেষ্ঠ সংস্কৃত পণ্ডিতদের সাথে মিলে তিনি লক্ষ্মণ সেনের রাজসভার সাহিত্যিক গৌরব বৃদ্ধি করেছিলেন।
সাহিত্যিক অবদান ও দেওপাড়া প্রশস্তি
উমাপতি ধরের সাহিত্যিক কীর্তির সবচেয়ে বড় এবং নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ হলো ‘দেওপাড়া প্রশস্তি’। রাজা বিজয় সেনের সামরিক সাফল্য, সেন বংশের দাক্ষিণাত্যের আদি পরিচয় এবং দেওপাড়ায় ‘প্রদ্যুম্নেশ্বর’ মন্দির নির্মাণের বিস্তারিত বিবরণ তিনি এই প্রশস্তিতে অত্যন্ত চমৎকারভাবে লিপিবদ্ধ করেন। এটি ৩৬টি সুলিখিত সংস্কৃত শ্লোকে রচিত, যা তাঁর ভাষা, ছন্দ ও অলংকার শাস্ত্রের ওপর অসামান্য দখলের প্রমাণ দেয়। তাঁর এই প্রশস্তিটি কেবল একটি সাহিত্যকর্মই নয়, বরং প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস পুনর্গঠনে ইতিহাসবিদদের কাছে এটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাথমিক উৎস (Primary Source)।
মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি
কবি হিসেবে উমাপতি ধর ছিলেন শব্দচয়ন ও বাক্যগঠনে অত্যন্ত নিপুণ। তাঁর সমসাময়িক সর্বশ্রেষ্ঠ কবি জয়দেব তাঁর অমর কাব্য ‘গীতগোবিন্দম’-এর প্রস্তাবনায় উমাপতি ধরের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। জয়দেব তাঁর সম্পর্কে লিখেছিলেন, “উমাপতি ধর বাক্যকে পল্লবিত করতে পারেন”, অর্থাৎ সাধারণ শব্দকেও তিনি তাঁর লেখনীর জাদুতে অত্যন্ত প্রাণবন্ত, সুমধুর ও কাব্যময় রূপ দিতে পারতেন।
দুর্ভাগ্যবশত, উমাপতি ধরের রচিত কোনো পূর্ণাঙ্গ খণ্ডকাব্য বা মহাকাব্যের সন্ধান আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে প্রাচীন বাংলার বিখ্যাত শ্লোক সংকলন গ্রন্থ শ্রীধর দাসের ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’-এ উমাপতি ধরের নামে ভণিতাযুক্ত অসংখ্য চমৎকার শ্লোক সংরক্ষিত রয়েছে। প্রাচীন বাংলার সংস্কৃত সাহিত্যের প্রসারে এবং সেন সাম্রাজ্যের ইতিহাসকে চিরস্থায়ী রূপ দানে উমাপতি ধরের অবদান অনস্বীকার্য।