কে ফোর্স

মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে গতিশীলতা আনার লক্ষ্যে এবং নিয়মিত বাহিনীকে সুসংগঠিত করার জন্য ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মুজিবনগর সরকার বাংলাদেশ বাহিনীর দ্বিতীয় ব্রিগেডটি গঠন করে। তৎকালীন ২নং সেক্টরের অধিনায়ক মেজর খালেদ মোশাররফের নামের আদ্যক্ষর ‘K’ (কে) অনুসারে এই ব্রিগেডের নামকরণ করা হয় ‘কে ফোর্স’। কে ফোর্স ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শক্তিশালী একটি নিয়মিত ব্রিগেড, যারা বৃহত্তর কুমিল্লা, নোয়াখালী এবং আখাউড়া অঞ্চলের রণাঙ্গনে অসাধারণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছিল।

কে ফোর্স মূলত তিনটি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল। ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন মেজর এ.টি.এম. হায়দার, ৯ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন মেজর এ.এস.এম. জিয়াউর রহমান (জিয়াউদ্দিন) এবং ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন মেজর আবদুল গাফফার। এই ইউনিটগুলোর পাশাপাশি কে ফোর্সের নিজস্ব আর্টিলারি ব্যাটারি এবং অন্যান্য সহায়ক ইউনিট ছিল, যা তাদের সম্মুখ যুদ্ধের সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

আরো পড়ুন:  শুক্লধ্বজ

কে ফোর্সের প্রধান রণক্ষেত্র ছিল বৃহত্তর কুমিল্লা এবং নোয়াখালী জেলা। আখাউড়া, ভৈরব রেললাইন এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে পাকিস্তানি বাহিনীর শক্ত অবস্থানের বিরুদ্ধে কে ফোর্সকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তাদের কৌশলের অন্যতম দিক ছিল পাকিস্তানি সেনাদের দুর্গগুলোকে চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ করে তাদের আত্মসমর্পণ বা পিছু হটতে বাধ্য করা।

কে ফোর্সের নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধগুলো ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং আক্রমণাত্মক। মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ সম্মুখ যুদ্ধগুলোর একটি ছিল আখাউড়া যুদ্ধ। আখাউড়া মুক্ত করার জন্য কে ফোর্সের যোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর একের পর এক আক্রমণ চালান। এই যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয় এবং ডিসেম্বর মাসের শুরুতে আখাউড়া মুক্ত হয়। কসবা ও গঙ্গাসাগর এলাকায় কে ফোর্সের যোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রবল আক্রমণ পরিচালনা করে এবং তাদের সীমান্ত প্রতিরক্ষা ভেঙে দেয়। আখাউড়া ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া মুক্ত করার পর কে ফোর্সের যোদ্ধারা সরাসরি ঢাকা অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকেন এবং ১৬ই ডিসেম্বরের আগে তারা ঢাকার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন।

আরো পড়ুন:  লস্কর পরাগল-খান

কে ফোর্সের অন্যতম বড় সাফল্য ছিল সেক্টরের গেরিলা যোদ্ধাদের সাথে নিয়মিত বাহিনীর সদস্যদের চমৎকার সমন্বয়। মেজর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে গঠিত ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ এর গেরিলা কার্যক্রম এবং কে ফোর্সের সম্মুখ যুদ্ধ পাকিস্তানি বাহিনীকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে ফেলেছিল। কে ফোর্সের অনেক যোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শন করেন। স্বয়ং অধিনায়ক মেজর খালেদ মোশাররফ এবং মেজর এ.টি.এম. হায়দারসহ এই ফোর্সে যুদ্ধ করা বহু সৈনিক বীর উত্তম ও বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত হন। কে ফোর্সের ধারাবাহিক বিজয়গুলো পূর্ব রণাঙ্গনে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রতিরক্ষা ব্যুহকে সম্পূর্ণভাবে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত ১৬ই ডিসেম্বরের চূড়ান্ত বিজয়ের পথ প্রশস্ত করে।

আরো পড়ুন:  কর্নেল আবু তাহের

কে ফোর্স ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে নিয়মতান্ত্রিক সামরিক শক্তির সেই অগ্রবাহিনী, যারা পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রতিটি পদে পদে পরাজিত করে রাজধানী ঢাকার দিকে এগিয়ে গিয়েছিল। খালেদ মোশাররফের সামরিক দূরদর্শিতা এবং এ.টি.এম. হায়দারের গেরিলা প্রশিক্ষণের সমন্বয়ে গঠিত এই ব্রিগেড আজও বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।