মেজর জেনারেল কে. এম. শফিউল্লাহ (কাজী মুহাম্মদ শফিউল্লাহ) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সেক্টর কমান্ডার, ‘এস ফোর্স’ (S-Force)-এর অধিনায়ক এবং স্বাধীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম নিয়মিত সেনাপ্রধান। মুক্তিযুদ্ধে একজন প্রথম সারির সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
মুক্তিযুদ্ধে এবং তৎপরবর্তী সময়ে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
জয়দেবপুর বিদ্রোহ ও মুক্তিযুদ্ধে যোগদান
১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চ মাসে মেজর শফিউল্লাহ জয়দেবপুরে (বর্তমান গাজীপুর) ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড (2IC) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯শে মার্চ জয়দেবপুরে স্বাধীনতাকামী জনতা ও পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে প্রথম সশস্ত্র সংঘর্ষ ঘটে। এরপর ২৫শে মার্চের কালরাত্রিতে ঢাকায় গণহত্যা শুরু হলে মেজর শফিউল্লাহ আর কালক্ষেপণ না করে তাঁর রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্যদের নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং নিজ বাহিনীসহ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
৩নং সেক্টরের অধিনায়ক
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে প্রতিরোধ পর্বের পর তাঁকে ৩নং সেক্টরের (সিলেট জেলার অংশবিশেষ এবং কুমিল্লা ও ঢাকা জেলার কিছু অংশ) কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এই সেক্টর পরিচালনা করেন। তাঁর অধীনে আখাউড়া-ভৈরব রেললাইন এবং এর পার্শ্ববর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র ও সফল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
‘এস ফোর্স’ (S-Force) গঠন ও নেতৃত্ব
রণাঙ্গনে সম্মুখ যুদ্ধ জোরদার করার লক্ষ্যে ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মুজিবনগর সরকার বাংলাদেশ নিয়মিত বাহিনীর (Regular Force) তিনটি ব্রিগেড গঠন করে। এর মধ্যে একটির অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পান মেজর কে. এম. শফিউল্লাহ। তাঁর নামের আদ্যক্ষর ‘S’ (এস) অনুসারে এই ব্রিগেডের নামকরণ করা হয় ‘এস ফোর্স’। ২য় এবং ১১তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট নিয়ে গঠিত এই ফোর্স বৃহত্তর সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং আখাউড়া অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর বেশ কয়েকটি ভয়াবহ ও সফল আক্রমণ পরিচালনা করে।
খেতাব ও সম্মাননা
মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব, চৌকস সামরিক রণকৌশল এবং সফল নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মানসূচক খেতাব ‘বীর উত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করে।
যুদ্ধোত্তর জীবন, সেনাপ্রধানের দায়িত্ব ও রাজনৈতিক জীবন
-
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের এপ্রিলে তাঁকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনিই ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নিয়মিত সেনাপ্রধান (Chief of Army Staff) এবং ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করেন।
-
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি সেনাপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। এই ট্র্যাজিক ঘটনার পর তাঁকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
-
সামরিক বাহিনী থেকে অবসরের পর তিনি বাংলাদেশ সরকারের হয়ে মালয়েশিয়া, কানাডা, সুইডেন এবং যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার হিসেবে দীর্ঘ সময় কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন।
-
কূটনৈতিক জীবন শেষে তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ-১) আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। এছাড়া তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘বাংলাদেশ অ্যাট ওয়ার’ (Bangladesh at War) রচনা করেছেন, যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।